চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৯০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের মালিকানাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বিএমএসআইএল)। বছরে সাড়ে ১২ লাখ টন সক্ষমতার এই সর্বাধুনিক গ্রিন স্টিল প্লান্টটি পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও গত দুই বছর ধরে উৎপাদনে যেতে পারছে না। নীতিনির্ধারণী জটিলতা, ব্যাংকিং প্রতিবন্ধকতা ও এলসি জটিলতায় থমকে গেছে চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্প।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কারখানাটির ভারী শেড, উৎপাদন ইউনিট ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও চারপাশ সুনসান। ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে আছে গলিত ইস্পাত পরিবহনের ৩০ টন ওজনের লেডেল কার, যা দৈনিক চার হাজার টন স্টিল উৎপাদনের উপযোগী হলেও আজ পর্যন্ত ঘুরেনি এর চাকা। খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল ও বাক্সে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে প্রায় ১৯ হাজার টন ভারী যন্ত্রপাতি ও ২০ হাজার টন স্টিল স্ট্রাকচার। রোদে-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান স্ক্র্যাপ শিয়ারিং মেশিন, ওভারহেড ক্রেন, ট্রান্সফরমার ও অটোমেশন প্যানেল।
প্রকল্পটির ঊর্ধ্বতন প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ রেজওয়ানুল ফেরদৌস জানান, ২০২১ সালে শুরু হওয়া দেশের একক বৃহত্তম এই ইস্পাত কারখানাটি ২০২৪ সালের মাঝামাঝি উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রকল্পটি স্থবির হয়ে পড়ে।
নথিপত্র অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য আমদানি করা প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকার ক্যাপিটাল মেশিনারিজ চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে রয়েছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও সময়মতো শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় না হওয়ায় ডেমারেজ ও পোর্ট চার্জ বাবদ জমা হয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকার বাড়তি দায়।
জানা যায়, অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের কনসোর্টিয়াম প্রকল্পটির জন্য দুই হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ অনুমোদন করলেও ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা (২৪.৫১ শতাংশ)। বাকি এক হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা ছাড় না হওয়ায় অর্থায়ন সংকট চরম আকার ধারণ করে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে বসুন্ধরা গ্রুপ পাঁচটি পৃথক করপোরেট কাঠামোতে বিভক্ত হলেও ২০২৪ সালের পর তাদের একক ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয় বলে দাবি প্রকল্প কর্মকর্তাদের। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিএমএসআইএলকে পৃথক বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া হলেও ততদিনে দেনা ও সুদ বহুগুণ বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বছরে ৭৫ লাখ টন ইস্পাতের চাহিদার বিপরীতে কারখানাটি চালু হলে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত গ্রেডেড স্টিল সরবরাহ নিশ্চিত হতো। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় সাত হাজার এবং পরোক্ষভাবে অন্তত এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং সরকারের বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় হতো।
স্থানীয়দের অভিমত, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারে, তবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চাকা বন্ধ করে দেওয়া দেশের অর্থনীতি ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
kalprakash.com/IM