প্রায় দুই বছর পদটি শূন্য থাকার পর অবশেষে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) নতুন ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগের এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি নবনিযুক্ত ট্রেজারার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু হানিফ সরকার। তাঁর যোগদান বিলম্বিত হওয়ার কারণ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও জল্পনাকল্পনা তৈরি হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ট্রেজারার ছিলেন অধ্যাপক ড. মজিব উদ্দিন আহমদ। তিনি ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পদটি শূন্য ছিল।
গত ২৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু হানিফ সরকারকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে প্রজ্ঞাপন জারির এক মাস পার হলেও তিনি এখনো কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
এদিকে তাঁর নিয়োগের পর থেকেই এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরাম। সংগঠনটির দাবি, অধ্যাপক আবু হানিফ সরকার বিএনপিবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পক্ষের শিক্ষক। এসব অভিযোগ তুলে তাঁকে ট্রেজারার হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে একটি ব্যানারও টানানো হয়।
তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, অধ্যাপক আবু হানিফ সরকার একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সৎ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ একাডেমিশিয়ান হিসেবে পরিচিত।
ট্রেজারার পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ট্রেজারারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উপাচার্য ট্রেজারারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর নিজস্ব প্রশাসনিক ও একাডেমিক ব্যস্ততা রয়েছে। ফলে তিনি ব্যস্ত থাকলে বা কোনো কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকলে আর্থিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী অভিযোগ করেন, একটি কর্মকর্তা সংগঠনের প্রকাশ্য বিরোধিতার কারণে নতুন ট্রেজারারের যোগদান নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পরও জাতীয়তাবাদী পরিচয়ে একটি সংগঠন কীভাবে একজন নিয়োগপ্রাপ্ত ট্রেজারারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। তবে ট্রেজারারের যোগদান বিলম্বের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরামের বিরোধিতার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরামের সাধারণ সম্পাদকসহ সংগঠনটির কয়েকজন নেতার অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল, যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মামদুদ রহমান বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী কিংবা আওয়ামী লীগের সুপারিশে চাকরি পেয়েছি, এগুলো তো কেউ বিবৃতি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবে না।
নতুন ট্রেজারারের যোগদান প্রসঙ্গে মামদুদ রহমান বলেন, এটা তো আমরা বলতে পারব না। তাঁকে তো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়পত্র দেয়নি। সেখানকার বিএনপিপন্থী সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তিনি তাদের সংগঠনের নন। এ কারণে হয়তো তিনি যোগ দিতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে নবনিযুক্ত ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. আবু হানিফ সরকার বলেন, সরকার আমাকে নিয়োগ দিয়েছে। অবশ্যই যাচাই-বাছাই ও যোগ্য মনে করেই আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি তো যোগদানের জন্য প্রস্তুতই ছিলাম। তবে বিভিন্ন কারণে এখনো যোগদান করতে পারছি না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ট্রেজারার নিয়োগের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহকারী সচিব সুলতান আহমেদ বলেন, এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন।
kalprakash.com/IM