জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের আপামর জনতা। তৎকালীন সরকারের পতনের লক্ষ্যে চলা সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে অংশ নিয়ে অনেকেই শরীরে বুলেট ও স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন, অনেকে বরণ করেছেন পঙ্গুত্ব। অথচ অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দেবিদ্বারের রাজপথে বুলেট ও নির্যাতনের শিকার চার লড়াকু যোদ্ধার নাম এখনো ওঠেনি সরকারের চূড়ান্ত ‘জুলাই আহত’ কিংবা গেজেট তালিকায়। চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে দিশেহারা এসব পরিবার এখন রাষ্ট্রের ন্যূনতম স্বীকৃতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
বঞ্চিত এই চারজনের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ছাত্রদলের এক শীর্ষ নেতা, একজন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী এবং দুইজন সাধারণ শিক্ষার্থী। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের মতে, মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহের অভাব এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই আজও তাঁরা সরকারি গেজেট ও সহায়তার আওতাভুক্ত হতে পারেননি।
তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দেবিদ্বারে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর তৎকালীন শাসকদল ও তার অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা একযোগে হামলা চালায়। সেদিনের সেই বর্বরোচিত হামলায় দেবিদ্বারের রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং শত শত মানুষ আহত হন। সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন দেবিদ্বার উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব নাজমুল হাসান সরকার। আন্দোলন চলাকালে তাঁর মাথা, বুকসহ পুরো শরীরে মোট সাতটি গুলির স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। দীর্ঘ চিকিৎসাতেও শরীর থেকে সব স্প্লিন্টার বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরে মারাত্মক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটালেও সরকারি তালিকায় ঠাঁই হয়নি তাঁর।
একই দিনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চরম হিংস্রতার শিকার হন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মেহেদী হাসান রিয়াদ। ৪ আগস্ট আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহকালে ছাত্রলীগের এক নেতার নেতৃত্বে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তাঁকে ধাতব গ্যাস পাইপ দিয়ে পিটিয়ে মাথা গুরুতর জখম করা হয়, যার ফলে তাঁর বাঁ কানের পর্দা ফেটে যায় এবং বাঁ পায়ের জয়েন্ট ভেঙে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পঙ্গুত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এই সাংবাদিকের নামটিও বাদ পড়েছে আহতদের সরকারি তালিকা থেকে।
এছাড়া সেদিন রাজপথে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর আহত হন আরও দুই শিক্ষার্থী। তাঁদেরই একজন ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাজী ইয়াছিন, আন্দোলন চলাকালে যার বাঁ হাতের বাহু ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সী সাধারণ শিক্ষার্থী মো. সোহাগের ডান হাত গুলির স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পঙ্গুত্ব ও তীব্র যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বর্তমানে সোহাগ অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছেন। রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় এবং তদারকির অভাবে এই শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার তথ্যও জমা পড়েনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। অর্থাভাবে বর্তমানে তাঁদের সুচিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, কোনো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুবিধা বা অনুদানের আশা নয়, রাজপথে রক্ত দেওয়ার এই ঐতিহাসিক ত্যাগের যেন রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন হয়।
দেবিদ্বারের সর্বস্তরের জনগণ ও সুশীল সমাজ অনতিবিলম্বে সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে নাজমুল হাসান সরকার, মেহেদী হাসান রিয়াদ এবং শিক্ষার্থী ইয়াছিন ও সোহাগসহ বাদ পড়া এই চার আহতকে দ্রুত সরকারি ‘জুলাই তালিকা’ ও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। ওই দিন দেবিদ্বার সরকারি কলেজ রোড ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ছররা গুলি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হলে রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেদিনের সংঘাতের সময় ঘটনাস্থলে রুবেল হোসেন নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এছাড়া অনেকেই গুরুতর গুলিবিদ্ধ ও হামলার শিকার হন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া ৪ আগস্টের ওই একই দিনে ছররা গুলি, পিটুনি এবং বিভিন্ন হামলায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতাসহ বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। সংঘাতের তীব্রতায় রক্তভেজা সেই ৪ আগস্ট দেবিদ্বারের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় ও করুণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
kalprakash.com/IM