সৌদি আরবের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান কি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে? মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতি ও নতুন প্রতিরক্ষা সমীকরণের মধ্যে প্রশ্নটি ঘিরে আলোচনা বাড়ছে। রিয়াদ ও ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থার ইতিহাস থাকলেও সৌদির হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের জন্য সহজ হবে না। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন—সবকিছুই এ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও দুই দেশের অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সৌদি আরবের সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে ভূমিকা রেখেছেন। দুই দেশের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে যোগাযোগও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
তবে ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া আর প্রতিটি সংঘাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে সামরিক প্রতিশ্রুতি, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিণতি—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ইয়েমেন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয়। ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছিল, সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইসলামাবাদ সব পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণে সম্মত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো মিত্রকে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাগত সমর্থন দেওয়া এবং তার হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামার মধ্যে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকির বড় পার্থক্য রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নতুন নিরাপত্তা অংশীদারত্ব এবং সামরিক সমন্বয়ের উদ্যোগও বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের পাশাপাশি তুরস্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসছে।
তবে এসব অংশীদারত্বের উপস্থিতি থেকেই পাকিস্তান কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধে অংশ নেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত, সংঘাতের ধরন এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা: পাকিস্তানকে নিজস্ব সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সামাল দিতে হয়। বিদেশে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা ব্যয়বহুল হতে পারে।
আঞ্চলিক ভারসাম্য: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিলে সেই সম্পর্কগুলোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
সামরিক প্রতিশ্রুতির ধরন: প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা নিরাপত্তা চুক্তি থাকলেও তা ঠিক কোন পরিস্থিতিতে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, সেটি চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভরশীল।
এসব কারণে পাকিস্তান সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বা কূটনৈতিক তৎপরতার মতো বিকল্পকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেশটি কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। কিন্তু সেই সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে, রিয়াদ যেকোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে ইসলামাবাদকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে নামতে হবে। বরং সম্ভাব্য সংঘাতের ব্যাপ্তি, সৌদি আরবের ওপর হুমকির ধরন, বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত এবং পাকিস্তানের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
সৌদি আরবের পাশে থাকা এবং তার হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্যে পার্থক্যটি পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন। ইসলামাবাদ শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপ, সীমিত প্রতিরক্ষা সহায়তা নাকি কূটনৈতিক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেবে—তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট।
kalprakash.com/IM