আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে এখন অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়ায় সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। এমন আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম আরও কমার সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। তবে ডলারের গতিপ্রকৃতি, ফেডের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে মূল্যবান এই ধাতুর ভবিষ্যৎ।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬৫ ডলার ১২ সেন্টে নেমে আসে। পুরো সপ্তাহে দাম কমেছে ০.৭ শতাংশ। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ফিউচার বাজারে। ডিসেম্বরে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ০.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৯৮ ডলার ২০ সেন্টে পৌঁছেছে। বাজারের এই ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে—স্বর্ণের দাম কি আরও কমবে, নাকি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে?
মূল্যস্ফীতি বাড়ায় বাড়ছে দরপতনের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক তথ্য স্বর্ণবাজারে চাপ বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির উৎপাদক পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি সাড়ে চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। একই সময়ে ভোক্তা পর্যায়েও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সুদের হার কমানোর পরিবর্তে ফেডের আরও কঠোর নীতি গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিএমইর ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। এই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিলে স্বর্ণের দামে নতুন করে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
টিডি সিকিউরিটিজের বৈশ্বিক কমোডিটি কৌশল বিভাগের প্রধান বার্ট মেলেকের মতে, স্বর্ণের দাম বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে বাজারের গতিপ্রকৃতি এখন নিম্নমুখী সমর্থনসীমার দিকে ঝুঁকছে। ফেডের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা এর অন্যতম কারণ।
সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের দাম কেন কমতে পারে?
স্বর্ণে বিনিয়োগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ দেয় না। অন্যদিকে সুদের হার বাড়লে বন্ড ও সুদভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়তে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ স্বর্ণ থেকে সরে অন্য সম্পদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়লে ডলারের দর শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডলারের মূল্য বাড়লে অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলারে কেনা স্বর্ণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এতে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন মনে করেন, বছরের বাকি সময়ে স্বর্ণের দাম আরও কিছুটা কমতে পারে। ফেড সুদের হার বাড়াতে থাকলে এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
তাহলে কি স্বর্ণের দাম আর বাড়বে না?
স্বর্ণের দাম আরও কমতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেও নিশ্চিতভাবে দরপতনের পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ স্বর্ণ শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়; অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় নিরাপদ সম্পদ হিসেবেও এর চাহিদা বাড়ে।
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা কিংবা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা আবারও স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একইভাবে ফেডের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশার চেয়ে নমনীয় হলে বা ডলারের দর কমে গেলে স্বর্ণের দাম ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফেড দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখলে স্বর্ণের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
সামনে কোন দিকে যাবে স্বর্ণের বাজার?
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজারের গতিপথ নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর—যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য, ফেডের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ডলারের শক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।
সব মিলিয়ে স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণের দাম আরও কমার ঝুঁকি রয়েছে। তবে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ফিরে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই স্বর্ণের দাম বাড়বে নাকি কমবে, তার চূড়ান্ত উত্তর পেতে বিনিয়োগকারীদের নজর রাখতে হবে ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতিবিধির দিকে। সূত্র: রয়টার্স
দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম
নতুন দাম অনুযায়ী, ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৩১ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ১৪৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৭৬৭ টাকা।
এ ছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৬৮৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩২ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৮ টাকা।
kalprakash.com/IM