মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি বছর দ্বিতীয়বারের মতো ভারত সফরে আসছেন। কয়েক মাস ধরে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ চললেও কৌশলগত অংশীদার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন। তবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
আগামী সপ্তাহে ভারতীয় সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রুবিও। তবে এবারের সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যাচ্ছেন না তিনি। বরং ভারতের অর্থনৈতিক কেন্দ্র মুম্বাই এবং গুজরাটের শিল্প ও জ্বালানিকেন্দ্র জামনগর সফরের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এসব সফরে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
জামনগরে অবস্থিত ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সটি বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত। ফলে জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত বাণিজ্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত না হওয়াই রুবিওর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, জ্বালানি আমদানি নিয়ে মতপার্থক্য এবং ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—সব মিলিয়ে দুই দেশের আলোচকদের সামনে চুক্তি সম্পন্ন করার পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ছয় দিনের বিদেশ সফর শুরু করবেন রুবিও। প্রথমে উজবেকিস্তান সফর শেষে তিনি ভারতে পৌঁছাবেন।
কেন পিছিয়ে যাচ্ছে বাণিজ্য চুক্তি?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ছিল। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল ভারতের।
কয়েক মাস ধরে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়নি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরও করা যায়নি।
এই বিলম্বের অন্যতম কারণ ট্রাম্পের শুল্কনীতির আইনি অনিশ্চয়তা। আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে তাঁর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ব্যবস্থাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল এই শুল্কব্যবস্থা।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তব এক বিশ্লেষণী নোটে উল্লেখ করেছেন, ফেব্রুয়ারির প্রস্তাবে ভারতকে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে শুল্ক কমানোর কথা ছিল। কিন্তু মার্কিন শুল্কব্যবস্থার ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ায় ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের কার্যকারিতা ও গুরুত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বিগ্ন ভারত। বিভিন্ন দেশের কথিত অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ রেখে নতুন আইনি উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে শুক্রবার ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত একটি নির্বাহী আদেশে সম্ভাব্য এসব নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতি কী?
বছরের বেশির ভাগ সময় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বাণিজ্য চুক্তির অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়টি দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে আশাবাদী ছিল। গত জুনে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানিয়েছিলেন, আলোচনার প্রায় শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে এবং চুক্তির বাকি অংশ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আশাবাদের পরিবর্তে সতর্কতার সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, আলোচনা কার্যত একটি জায়গায় এসে থমকে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে ছাড় দেওয়ার সুযোগও এখন সীমিত। এর কয়েক দিন আগে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল জানিয়েছেন, চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে চুক্তিটি কার্যকর করা হবে না। গয়ালের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির চূড়ান্ত কাঠামো ও আইনি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। দ্রুত আলোচনা শেষ করার আশা থাকলেও ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত করেই চুক্তিটি কার্যকর করতে চায় নয়াদিল্লি।
কোন বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য?
বাণিজ্য আলোচনায় সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো কৃষি খাত। ভারতের বিপুলসংখ্যক কৃষকের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিদেশি কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেশীয় কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলতে চায় না নয়াদিল্লি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত যেন তাদের কাছ থেকে আরও বেশি জ্বালানি পণ্য আমদানি করে। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুল্কের হার নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। নয়াদিল্লির অবস্থান হলো, চূড়ান্ত চুক্তিতে এমন শুল্কহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারত পিছিয়ে না পড়ে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও জানিয়েছেন, চুক্তির আইনি ও কারিগরি প্রস্তুতি চললেও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটি কার্যকর করা হবে না।
অর্থাৎ শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করাই ভারতের লক্ষ্য নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের অবস্থান শক্তিশালী করাও নয়াদিল্লির কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যে ভারতের পরিস্থিতি কেমন?
শুল্ক নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। আগস্টে দেশটিতে ভারতের পণ্য রপ্তানি ২১ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি ভারতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য দেশটির অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, তাহলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চ শুল্কের কারণে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারতীয় মুদ্রা রুপির ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা ভারতের জন্য যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
রুবিওর সফর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক মতবিরোধ পাশাপাশি অবস্থান করছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। অন্যদিকে শুল্কনীতি, কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি আমদানির মতো বিষয়ে মতপার্থক্য দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরে বাণিজ্য চুক্তির অচলাবস্থা কাটানোর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয় কি না, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান থাকায় দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না।
শেষ পর্যন্ত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে বাণিজ্যিক মতবিরোধ কমানো যায় এবং একই সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করা যায়। সূত্র: ডন
kalprakash.com/IM