ফ্লাইদুবাইয়ের ইসরায়েলগামী বিমানে মাঝ আকাশে রক্তক্ষয়ী হামলা চালিয়ে বিমান বিধ্বস্তের চেষ্টা করা ওমানি সহকারী পাইলটের পরিচয় ও অতীত ইতিহাস প্রকাশ্যে এসেছে। চরমপন্থী ও উগ্র মতাদর্শে জড়িয়ে পড়ার সন্দেহে গত বছরই তাঁকে ওমানের জাতীয় এয়ারলাইনস ওমান এয়ারের পাইলট প্রশিক্ষণ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই সহকারী পাইলটের নাম হামাম আল-হামামি। তিনি ওমানি বাবা ও সিরীয় মায়ের সন্তান। এই ভয়াবহ ঘটনার পর বিমান সংস্থায় নিয়োগের আগে অপরাধমূলক বা সন্ত্রাসী ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই নিয়ে তোলপাড় ও প্রশ্ন উঠেছে।
হামামের লিংকডইন প্রোফাইল ও আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি ওমান এয়ারে সাত বছর কাজ করেন এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখান থেকে বাদ পড়েন। এরপর ২০২৫ সালের জুনে রয়্যাল এয়ার মারোকে যোগ দিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেটিও ছেড়ে দেন। মাত্র আট মাস আগে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দিয়েছিলেন। তবে লিংকডইন প্রোফাইলে এ বিষয়ে কিছু ছিল না।
বুধবার ককপিটের ওই ঘটনার প্রায় ৯ ঘণ্টা পর হামামের মুছে ফেলা লিংকডইন ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দুটি উসকানিমূলক পোস্ট প্রকাশিত হয়। এসব পোস্ট তিনি নিজে করেছিলেন, নাকি পূর্বনির্ধারিত (শিডিউল) কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
প্রথম পোস্টে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের ককপিট থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবরের একটি ফ্লাইটে তিনি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইসরায়েলের এল আল ও আরকিয়া এয়ারলাইনসের একাধিক বিমান জুম করে দেখছেন। ভিডিওটির একেবারে শেষ ভাগে আল-কায়েদার প্রয়াত নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং ২০০৯ সালে সিআইএ কর্মকর্তাদের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালানো আল-কায়েদা ক্যাডার হুমাম খলিল আবু-মুলাল আল-বালাবির ছবি ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয় পোস্টে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ছবিতে মক্কা, মদিনা ও জেরুজালেমের তিনটি পবিত্র স্থানকে আলোর রেখা দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে। নেপথ্যে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মর্যাদার লড়াই করার আকুল আহ্বান জানিয়ে কাসিদা ও কবিতা বাজছিল।
সিএনএনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অনুসন্ধান মডেলের মাধ্যমে হামামের প্রায় তিন হাজার মুছে ফেলা আগের বার্তা পর্যালোচনা করে তাঁর চরম উগ্রপন্থা ও নারীবিদ্বেষী মনোভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, তাঁর মা তাঁর জন্য কনে খুঁজতে গিয়ে কষ্টে পড়েছিলেন। কারণ, তাঁর শর্ত ছিল স্ত্রীকে অবশ্যই নিকাব পরতে হবে এবং বিয়ের পর চাকরি ছাড়তে হবে। প্রথমে মেয়েরা অস্বীকৃতি জানালেও যখন তাঁর মা বলতেন, আমার ছেলে পাইলট, তখন নাকি সবাই সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেতেন। এ ছাড়া নারী-পুরুষের একসঙ্গে কাজের পরিবেশ নারীসমাজকে ধ্বংস ও চরিত্রহীন করে দিচ্ছে বলেও তিনি একাধিক পোস্ট করেছিলেন।
ওমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর সুরক্ষাবেষ্টিত ইসরায়েলের তেল আবিবগামী একটি আন্তর্জাতিক বিমানের ককপিটে ওমানের একজন নাগরিক কীভাবে পাইলটের দায়িত্বে বসলেন, তা নিয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে ইসরায়েলের শিন বেত, মোসাদ, সামরিক বাহিনী এবং দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত বা আন্তর্জাতিক সংযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল আলাদা সন্ত্রাসী তদন্ত শুরু করেছেন। বিমানটি ইউএই-র রেজিস্টার্ড হওয়ায় তাঁদের আইনগত এখতিয়ার রয়েছে।
অন্যদিকে, জরুরি অবতরণের পর সৌদি আরবে আটকে থাকা ওই হামলাকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এতে ইউএই-র প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সম্মতিক্রমে ইসরায়েলি গোয়েন্দারাও সরাসরি অংশ নিচ্ছেন।
kalprakash.com/IM