যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে জি৭ভুক্ত দেশগুলো। একই সঙ্গে জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) এক যৌথ বিবৃতিতে জি৭ নেতারা জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে চার মাস ধরে এসব জ্বালানি বাজারে ছাড়া হবে। এর মধ্যে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই জি৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়বে।
এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জরুরি ডিজেল মজুত কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছিল, ইউরোপ পদক্ষেপ না নিলে ওয়াশিংটন ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এমন পদক্ষেপ ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারত। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানির ওপর ইউরোপের নির্ভরতা বেড়েছে।
তবে শুক্রবার আলাবামার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেবে না। তিনি বলেন, বিষয়টি কখনোই চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় ছিল না। যদিও এর আগে গত দুই সপ্তাহে একাধিকবার তিনি এমন নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইউরোপের কাছে প্রচুর ডিজেল রয়েছে এবং তারা বিশ্বে বড় ধরনের অবদান রাখতে যাচ্ছে। আমরাও তা করব। আমরা ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছি না।’
পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইউরোপ বিপুল পরিমাণ মজুত ডিজেল তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে শুরু হবে।’
চার মাস ধরে চলবে মজুত ছাড়ার কার্যক্রম
জি৭-এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আইইএর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে। তবে এর কতটা মার্চে সম্মত হওয়া আগের মজুতের অংশ, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল চলতি সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, মার্চে সম্মত হওয়া ৪০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
নতুন করে মজুত ছাড়ার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হয়ে চার মাস চলবে। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই জি৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়বে বলে জানিয়েছে জোটটি।
তবে অপরিশোধিত তেল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের মধ্যে কোনটির কত পরিমাণ বাজারে ছাড়া হবে এবং কোন কোন দেশ এতে অংশ নেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
জি৭ আরও জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ডিজেল মজুত ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আইইএর আওতায় আলোচনা করা হবে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
ইরান যুদ্ধের কারণে মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে আইইএর সমন্বয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুত ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল আমদানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উপসাগরীয় উৎপাদক দেশগুলো থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার পর চলতি বছর ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়েছে।
শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলো ফ্রান্সের একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করে। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ওই প্রস্তাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর জরুরি মজুত থেকে ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল এবং আইইএর সদস্যদের কাছ থেকে আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ার কথা বলা হয়েছিল।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়া হলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জরুরি ডিজেল ও গ্যাসঅয়েল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান হবে। একই পরিমাণ জ্বালানি জোটটির বার্ষিক ডিজেল ব্যবহারের প্রায় ৩ শতাংশ।
মজুত ছাড়ার আলোচনা প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল ফিউচারের দাম ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ৪৯ ডলারে নেমে আসে। ইউরোপের বেঞ্চমার্ক ডিজেল ফিউচারও প্রায় ৮৩ ডলার বা ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে।
জি৭-এর বিবৃতিতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও আপাতত কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: রয়টার্স
kalprakash.com/IM