দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে হাইজ্যাকের চেষ্টা ঘিরে রহস্য এখনো কাটেনি। বিমানের নাম প্রকাশ না হওয়া কো-পাইলট কেন ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন, তাঁর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এই ঘটনার পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন ইসরায়েলি রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশে ফিরে আসা যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর পাশাপাশি ঘটনাটিকে ইসরায়েলবিরোধী অপপ্রচারের ফল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
একই সঙ্গে তিনি ইরান ও তাদের মিত্রদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যদিও হাইজ্যাকের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা পেছনে কারা ছিল, তা নিশ্চিত করার সময় এখনো আসেনি বলে নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন।
এরপরও বৃহস্পতিবার তিনি দাবি করেন, ওই কো-পাইলট ইসলামপন্থি উগ্রবাদী ভাবধারায় দীক্ষিত হয়েছিলেন। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান ও তাদের মিত্ররা বিদেশে ইসরায়েলিদের ওপর হামলা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কারণ চলতি মাসের শেষ দিকে ইসরায়েলে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করবে নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে আসছেন। ফলে বিমানে হাইজ্যাকের এই চেষ্টা তাঁর সেই নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বয়ানকে আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি করেছে।
ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে বলেন, এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে ঘটনাটি নেতানিয়াহু যে বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় দেখতে চান না, সেগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিতে পারে।
লেভি বলেন, সামনে ৭ অক্টোবরের আরেকটি বার্ষিকী আসছে। সেই সময়ের বদলে ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার গল্প সামনে চলে আসতে পারে। যুক্তরাজ্যে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির কাছাকাছি সাম্প্রতিক একটি ঘটনাতেও ইরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার দাবি উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য, অর্থাৎ ইরানের ওপর আবারও তীব্র হামলা চালানোর পক্ষে পরিবেশ তৈরি করতে নতুন গতি দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকেও জনদৃষ্টি সরিয়ে দিতে পারে এবং সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া তাঁর নিরাপত্তা সতর্কবার্তাগুলোকে প্রাসঙ্গিক হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
এর আগে মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের শত্রুরা দেশটির ওপর হামলার চেষ্টা চালাতে পারে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে তাঁর বিরোধীরা দ্রুতই এই সতর্কবার্তার সমালোচনা করে একে তথ্যপ্রমাণহীন ভয় দেখানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎসও ঘটনাটিকে জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুর আগের নিরাপত্তা সতর্কবার্তার কথাও টেনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তিনি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যখন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেন, তখন সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।
তবে এই ঘটনার সঙ্গে নেতানিয়াহুর আগের সতর্কবার্তার যোগসূত্রের দাবি নাকচ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। মঙ্গলবার রাতে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে নিরাপত্তাবিষয়ক ব্রিফিং পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বুধবার তিনি বলেন, ওই বৈঠকে বিমানের ঘটনার কাছাকাছি কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি।
রাজনৈতিক ফায়দার অভিযোগ
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিমানে হাইজ্যাকের চেষ্টার পর তাঁর দ্রুত প্রতিক্রিয়া সংকটকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের কৌশলেরই অংশ।
কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র টিচিং ফেলো ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান আল জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহু এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা ইসরায়েলে অবতরণের পরপরই তাঁকে এমন একজন ইসরায়েলি ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে, যিনি কো-পাইলটকে কাবু করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
তবে ব্রেগম্যান মনে করেন না যে, এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিকভাবে কতটা সুবিধা দেবে। তাঁর মতে, জনমত জরিপে নির্বাচনে নেতানিয়াহু অল্প ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন।
ব্রেগম্যান বলেন, এই হামলা নেতানিয়াহুকেও অন্য সবার মতোই বিস্মিত করেছে। তবে ইরানের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো যোগসূত্র নিশ্চিত করা গেলে সেটি তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে তেহরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর যুক্তিও সামনে আসতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ওই সংঘাত থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে।
ব্রেগম্যানের মতে, ফ্লাইটটিতে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই বড় ধরনের ত্রুটি ছিল এবং এর তদন্ত প্রয়োজন। ঘটনাটি আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত। তবে কয়েকজন সাহসী যাত্রী এবং সৌভাগ্যের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে।
নিপীড়িত বয়ান সামনে আনছেন নেতানিয়াহু
বুধবার মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ব্যর্থ হাইজ্যাকের পেছনে কারা ছিল, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে তাঁর দাবি, কো-পাইলটের কর্মকাণ্ড অভাবনীয় মাত্রার ধর্মান্ধতা ও ঘৃণা থেকে এসেছে।
তিনি ইঙ্গিত করেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে তৈরি ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গেও এই মনোভাবের সম্পর্ক রয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরায়েলি হামলা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে বেশ কিছু দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েল সাতটি ফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি একটি অষ্টম ফ্রন্টের বিরুদ্ধেও লড়ছে। তাঁর ভাষায়, সেটি হলো সত্যের লড়াই, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে।
আল জাজিরাসহ বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমগুলোর সমালোচনা করে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, এসব গণমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে প্রভাবিত করছে।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায়, এটি আল জাজিরা ও এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অভিযানের আরেকটি উদাহরণ। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় তাদের ১২ জন সহকর্মী নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।
চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ইসরায়েল সরকার ফ্লাইদুবাইয়ের এই ঘটনাকে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে চাইবে।
তাঁর মতে, ঘটনাটি ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলিদের মধ্যে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক আঘাতের অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে যেসব দেশ ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চাওয়া পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, এমন ধারণা থেকে ইসরায়েলিদের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে, সেটিও আরও তীব্র হতে পারে।
তবে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে হাইজ্যাকের চেষ্টা করা কো-পাইলটের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর পেছনে আদৌ কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল কি না। তদন্তের সেই উত্তর আসার আগেই ঘটনাটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
kalprakash.com/IM