রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালক পদে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ড. মো. মনিরুজ্জামান এবং বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালক পদে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম জীবনকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তবে সম্ভাব্য এ দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালকের দায়িত্ব বর্তমানে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. মো. মনিরুজ্জামানকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। জনসংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন শিক্ষককে দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জামান বলেন, জনসংযোগ দপ্তরের কাজের সঙ্গে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ সরাসরি জড়িত। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকদেরও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন শিক্ষককে কেন এ দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি তাদের কাছে প্রশ্নের বিষয়।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মুরসালিন মুন্না বলেন, বেরোবির জনসংযোগ শাখায় দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার দাবি, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী লিয়েনে আরবি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে এলেও তাকে নিজ শাখায় দায়িত্ব না দিয়ে রেজিস্ট্রার শাখায় ওএসডি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি পিএইচডিতে ভর্তি হয়ে ছুটিতে যান।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জনসংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখাকে পেশাদার ও স্বাধীনভাবে পরিচালনার পরিবর্তে পছন্দের শিক্ষকদের দিয়ে প্রভাবিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ড. মো. মনিরুজ্জামানের পিএইচডি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ছুটি না নিয়েই তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে ব্যাকডেটেড ছুটির আবেদন করা নিয়ে তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয় বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ড. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ড. মনিরুজ্জামান বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকার সময় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা কয়েক দফা আন্দোলন করেন। আন্দোলনকারীরা ভিসির কার্যালয় ও বাসভবন ঘেরাও করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে উপাচার্যের হস্তক্ষেপে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। এ অবস্থায় তাকে জনসংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার খবরেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালকের দায়িত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম জীবনকে দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নম্বর টেম্পারিংয়ের অভিযোগ ওঠে এবং পরবর্তীতে তিনি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ অভিযোগ তদন্তে কমিটিও গঠন করেছিল।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাঁকে ওই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অডিওগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।
নতুন করে তাকে বহিরাঙ্গন কার্যক্রমের পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ পদে দায়িত্ব পেলে তিনি সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শিবলী সাদিক বলেন, বহিরাঙ্গন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্তের বিষয় থাকলে তাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধি ও প্রক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার দাবি, ড. তানজিউল ইসলাম জীবনের বিরুদ্ধে পূর্বে অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তিনি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব থেকেও পদত্যাগ করেছিলেন। এ অবস্থায় তাকে আবার প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, “এখনো যেহেতু আমরা বিষয়টি অফিসিয়ালি প্রকাশ করিনি, আগে থেকে ধারণা করে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে যিনি অভিজ্ঞ, তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।”