অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাকপ্যাকারদের ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার শর্তেও কঠোর পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। ক্রমবর্ধমান অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক নতুন ভিসা নীতি ও কড়াকড়ির বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেশির ভাগ স্টুডেন্ট ভিসায় শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সেকেন্ডারি আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের কিছু দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বামী বা স্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে পারেন। তবে তারা কত ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন, তা শিক্ষার্থীর পড়াশোনার কোর্সের ওপর নির্ভর করে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাদের পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার এই সুবিধা হারাবেন।
ব্যাকপ্যাকারদের ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আগ্রহীদের জন্য লটারিভিত্তিক ব্যালট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার।
একই সঙ্গে সব ভিজিটর ভিসায় ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করা হবে। এর ফলে ভিজিটর ভিসায় থাকা কেউ অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে পার্টনার ভিসার মতো অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করে থাকার মেয়াদ বাড়াতে পারবেন না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসা নবায়নের ক্ষেত্রেও নিয়ম কঠোর করা হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভিসা নবায়ন করতে হলে শিক্ষার্থীদের আগের যোগ্যতার চেয়ে উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষায় অগ্রসর হতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করার কথা জানিয়েছে। এ জন্য আরও ১০০ জন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি মেলবোর্নে মহামারির সময় ব্যবহৃত একটি কোয়ারেন্টাইন স্থাপনা অভিবাসন আটককেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় সাময়িকভাবে আসতে চাইলে সাময়িক ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। আর স্থায়ীভাবে থাকতে চাইলে স্থায়ী ভিসার আবেদন করতে হবে। বৈধ ভিসা না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়া ছাড়তে হবে।
সরকারের এই উদ্যোগের ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় বার্ষিক নিট অভিবাসন প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। করোনা মহামারির আগের সময়ের কাছাকাছি অভিবাসন নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
অস্ট্রেলিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসন সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দেশটির কট্টর ডানপন্থি ওয়ান নেশন পার্টি আগামী তিন বছরে সাময়িক অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমানোর দাবি জানিয়েছে। দলটির ভাষ্য, এতে অস্ট্রেলীয়রা কিছুটা স্বস্তির সুযোগ পাবেন।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্ক বলেছেন, ওয়ান নেশন পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কাজ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত থেকে দেশটির আয় হয়েছে ৫৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। এটি অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি খাত। তবে অভিবাসন কমানোর সরকারি উদ্যোগে বিদেশি শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
গত চার বছরে স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার যোগ্যতা ও গ্র্যাজুয়েট ভিসার আবেদনকারীদের ন্যূনতম সঞ্চয়ের শর্তও কঠোর করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটিজ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী লুক শিহি বলেছেন, প্রস্তাবিত নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, এই খাত অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুই বছর পর সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন দ্রুত বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ব্যাকপ্যাকার ও সাময়িক কর্মীদের বড় অংশগ্রহণের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটে। তবে গত দুই বছরে সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।
২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে নিট বিদেশি অভিবাসন ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিলেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ১৮ হাজারে পৌঁছেছিল।
kalprakash.com/IM