রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | সকাল ১১:২৩:১৪

পৃথিবী কি আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ২:০৪
শেয়ার: mail
পৃথিবী কি আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা বিনা পূর্বাভাসেই তছনছ করে দিতে পারে পুরো জনপদ। এর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম না থাকলেও ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় বিশ্ববাসীর মনে বড় ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—পৃথিবী কি তবে আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে?

চলতি বছরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলে এই আতঙ্ক একেবারে অমূলক মনে হবে না। গত ২৪ জুন ভেনিজুয়েলায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ হাজার ৪৩৮ জন, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্র্যাজেডি। এর আগে ৭ জুন ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী কম্পন; এতে প্রাণ যায় ৭৭ জনের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ১৬ লাখ মানুষ।

ভূমিকম্পের এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল চলতি আগস্টেও। ১০ আগস্ট কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শতাব্দীপ্রাচীন ভয়াবহ কম্পনে ৩১৯ জনের মৃত্যু হয়। এর চার দিন পর, ১৪ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা টেঙ্গারা অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূকম্পনে মারা যান অন্তত ৫৩ জন। এ ছাড়া ২৮ জুলাই জাপানের কুমামোতোতে ৬ দশমিক ৮ মাত্রা এবং সম্প্রতি পেরুতে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। তবে উন্নত প্রযুক্তি ও ভূমিকম্পসহনীয় অবকাঠামোর কারণে জাপানে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

পরপর ঘটে যাওয়া এসব বড় দুর্যোগ সাধারণ মানুষের মনে ভয় ধরালেও বিজ্ঞানীরা একে দেখছেন ভিন্নভাবে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার এই ধারণাটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে ১৫টি ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার বড় ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এমন বড় কম্পন রেকর্ড হয়েছে ১১টি।

গবেষণার তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়, যার দৈনিক গড় প্রায় ৫৫টি। তবে এর সিংহভাগই এত মৃদু যে মানুষ তা টের পায় না। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বছরে গড়ে ১৩৩টি ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম (৯৯টি) এবং ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি (১৫৭টি) এমন কম্পন হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৬ বা তার বেশি মাত্রার ৯২টি ভূমিকম্পের ঘটনা পরিসংখ্যানগতভাবে স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই পড়ে।

ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, পৃথিবীর উপরিভাগ কতগুলো বড় টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেট যখন পরস্পরের কাছাকাছি আসে, দূরে সরে যায় বা ঘর্ষণ তৈরি করে, তখন জমা হওয়া প্রচণ্ড শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূকম্পন ঘটায়। প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা রিং অব ফায়ার অঞ্চলেই বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বড় ভূমিকম্প ঘটে থাকে। অন্যদিকে জাভা থেকে হিমালয় ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আল্পাইড বেল্টও অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সাম্প্রতিক অধিকাংশ কম্পন এই দুটি জোনেই ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবী এখন আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে না; বরং আধুনিক সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের সুবাদে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কম্পনও সহজে শনাক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৌলতে যেকোনো প্রান্তের দুর্যোগের খবর তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় মনে হচ্ছে ভূমিকম্প হঠাৎ বেড়ে গেছে।

মূলত ভূমিকম্পের তীব্রতার চেয়েও ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করে এর গভীরতা, উপকেন্দ্র থেকে লোকালয়ের দূরত্ব, মাটির গঠন এবং স্থানীয় ভবনের নির্মাণশৈলীর ওপর। উন্নত প্রযুক্তির কারণে জাপান যেমন বড় ধাক্কা সামলে নিতে পারে, দুর্বল অবকাঠামোর দেশগুলোতে তুলনামূলক কম মাত্রার কম্পনও ডেকে আনে মহাবিপর্যয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবী অস্বাভাবিক কাঁপছে না, তবে সুরক্ষিত থাকতে প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি ও টেকসই অবকাঠামো।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

পৃথিবী কি আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে

বিস্তারিত কমেন্টে