বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলো শ্রমিক অধিকার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এতে বেশ কিছু অসংগতি রয়ে গেছে বলে মত দিয়েছেন শ্রম বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কিছু ধারা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, যৌথ দর-কষাকষি এবং কর্মক্ষেত্রের গণতান্ত্রিক চর্চাকে সীমিত করতে পারে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে সলিডারিটি সেন্টার আয়োজিত এক অংশীজন সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় সংশোধিত শ্রম আইনের ইতিবাচক দিক, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এ কে এম নাসিম। তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনা ও ত্রিপক্ষীয় পরামর্শের ভিত্তিতে প্রণীত সংশোধনীগুলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শ্রমিক প্রতিনিধিদের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চূড়ান্ত আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়াকে সীমিত করেছে।
প্রবন্ধে বলা হয়, সংশোধনের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে গৃহশ্রমিকদের আংশিক স্বীকৃতি, ছাঁটাইকালীন ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিনে উন্নীতকরণ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধান শক্তিশালীকরণ এবং এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম চালুর উদ্যোগ।
তবে একই সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে নতুন সদস্যসংখ্যার শর্তকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংখ্যা সামান্য পরিবর্তন হলেই ইউনিয়ন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সদস্যসংখ্যা হঠাৎ পরিবর্তিত হচ্ছে, যা সংগঠন গঠনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা তিনটিতে সীমাবদ্ধ রাখার বিধানকে শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত করার ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে অনেক শ্রমিক সংগঠনের বাইরে থেকে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর পরিচালক মো. বরকত আলী বলেন, সংবিধান আমাদের সংগঠিত হওয়ার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা সীমিত করা সেই অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ত্রিপক্ষীয় আলোচনা প্রক্রিয়ায় এবার যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। মতামত নেওয়া হলেও কার্যকর আলোচনা হয়নি, যা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া দরকার ছিল।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াসিম জাকারিয়া বলেন, শ্রম আইনের সংশোধনীতে কিছু অসংগতি রয়ে গেছে। সরকার এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন এবং মালিকপক্ষ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে বলেও জানান।
সব মিলিয়ে সংশোধিত শ্রম আইনকে অগ্রগতির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ ও কিছু ধারা নিয়ে শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















