শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গায় দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ছয় দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসবকে ঘিরে চুয়াডাঙ্গা জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পূজাকে কেন্দ্র করে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। একই সঙ্গে উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলার বিভিন্ন মন্দির সূত্রে জানা গেছে, এ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলার চার উপজেলায় মোট ১১৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৩৩টি, আলমডাঙ্গায় ৩৯টি, দামুড়হুদায় ২১টি এবং জীবননগরে ২৪টি মণ্ডপ রয়েছে। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে আলমডাঙ্গা উপজেলায়। বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন, প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজ ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে ব্যস্ত সময় পার করেছেন মন্দির কমিটির আয়োজক, কারিগর ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনে মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ও নাইটভিশন ক্যামেরা। পাশাপাশি পূজার দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টি নিয়েও ভাবছে প্রশাসন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন দুর্গা মন্দির ঘুরে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে উৎসবের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের চারপাশ আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়ে উঠেছে। পূজাকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। পূজার দিনগুলোতে ভক্ত-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপগুলো। নতুন পোশাক পরা, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপ পরিদর্শন এবং পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করা এবং আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে উৎসবটি হয়ে উঠবে সর্বজনীন মিলনমেলা।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে শহরের দৌলাতদিয়াড় দক্ষিণ পাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির, সত্যনারায়ণ মন্দির, তালতলা মন্দির ও মালোপাড়া মন্দিরে। শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় দিন মহাসপ্তমীতে অনুষ্ঠিত হবে নবপত্রিকা প্রবেশ ও পূজা। মহাষ্টমীতে মহাষ্টমীর পূজা, অঞ্জলি ও সন্ধিপূজা এবং মহানবমীতে পূজা ও হোমযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। এদিন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা।
কথা হলে সনাতন ধর্মাবলম্বী অর্পণ চক্রবর্তী বলেন, ‘সব অপেক্ষা শেষে দুর্গাপূজা শুরু হলো। এই পূজার দিনগুলো ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাস ভাগাভাগি করে কাটাব। মা দুর্গার কাছে আশীর্বাদ চাই, এবারও যেন সবাই সুস্থভাবে মায়ের পূজা করতে পারে।’
আরেক সনাতন ধর্মাবলম্বী পূজা রানী বিশ্বাস বলেন, ‘পূজা শুরু হওয়ায় মন্দিরের চারপাশে আনন্দ-উল্লাসে মেতেছে সবাই। পূজার পরও যেন সবার মনে আনন্দের আবহ থাকে, এই কামনা। সবাই সবার সঙ্গে শত্রুতা ভুলে নতুনভাবে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে শুরু করুক পূজার আনন্দ।’
চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর সীমান্ত এলাকার মন্দিরগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। জেলার সীমান্তবর্তী ২৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। একই সঙ্গে আগামী ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
বিজিবি জানায়, বিজিবি সদর দপ্তরের নির্দেশনায় নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় ব্যাটালিয়ন সদরের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ২টি এবং সীমান্তের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ২২টি পূজামণ্ডপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বিজিবি। পাশাপাশি গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাংলাদেশের ঐতিহ্য। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।’
kalprakash.com/IM