চীনের অর্থনৈতিক শ্লথগতি, তীব্র প্রতিযোগিতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসার দেশটির তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পেয়ে অনেক তরুণ-তরুণী চরম হতাশা থেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছেন; কেউ কেউ আবার শহর ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন ভবঘুরে জীবন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
একসময় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংকে নিরাপদ পেশা মনে করা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্তে সেই চিত্র বদলে গেছে। কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স পড়ার মাঝপথেই ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেন ২৭ বছর বয়সী তরুণ মা ইয়ংজিয়ান। ভবিষ্যতে ভালো চাকরির কোনো আশা না পেয়ে তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ইয়ংজিয়ানের মতো লাখ লাখ তরুণ আজ বুঝতে পারছেন, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও তাঁরা বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে ভালো বা স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছাতে পারছেন না।
একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি প্রযুক্তি খাতের কর্মী চেং মিং। দুটি রিয়েল এস্টেট ফার্ম থেকে ছাঁটাই হওয়ার পর তিনি অনলাইন কোর্সে সফটওয়্যার শিখে একটি ছোট প্রযুক্তিসেবা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। কিন্তু কিছুদিন পরই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং গত এপ্রিলে তিনি আবার চাকরি হারান। এআই ও প্রযুক্তির অস্থিতিশীল বাজারে টিকে থাকা কতটা কঠিন, চেং মিংয়ের একের পর এক চাকরি হারানোর ঘটনা তারই প্রমাণ।
নিজের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার চাপে পড়ে এক ধরনের আত্মসমর্পণের মতো হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
দুর্বল অর্থনীতির কারণে চীনে সামগ্রিক চাকরির বাজার মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এর ওপর আলিবাবা ও বাইটড্যান্সের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহারের পাশাপাশি নীরবে কর্মী ছাঁটাই চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের শহুরে বেকারত্বের হার প্রায় ১৯ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা ৭.৫ শতাংশ। স্থায়ী ও ভালো মানের চাকরি না পেয়ে তরুণদের বড় একটি অংশ এখন অনিয়মিত ও খণ্ডকালীন কাজের দিকে ঝুঁকছে।
উপার্জনের সুযোগ কমে যাওয়া ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে জেন জি প্রজন্মের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা, স্থিতিশীল জীবনযাপন, বিয়ে কিংবা সন্তান নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো কঠিন হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ তরুণ মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে বাবা-মায়ের মতো স্থিতিশীল জীবন গড়ে তোলা তাঁদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও নানামুখী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই না করতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেছে বেইজিং। তবে নীতিগত এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও তরুণদের হতাশা দূর করার মতো পর্যাপ্ত ও উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
kalprakash.com/IM