অবশেষে কার্যকর হয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তির আওতায় ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।
তবে এসব সেনা সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে, নাকি সৌদি ভূখণ্ড ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষায় থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির চলমান অভিযানে নতুন এই জোটের ভূমিকা কতদূর গড়াবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন দ্রুত শুরু করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর আওতায় চুক্তিভুক্ত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েন করা হবে।
তবে কতসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হবে এবং তাঁদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী হবে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এর মধ্যেই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পাল্টা অভিযানে ১০০টি যুদ্ধবিমান সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। হুতিদের কাছ থেকে গত মাসে দখল হওয়া অঞ্চল পুনরুদ্ধারই এই অভিযানের লক্ষ্য।
পাকিস্তানি বাহিনীর ভূমিকা কী?
রিয়াদে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, পাকিস্তানি বাহিনী ইতিমধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
সোমবার রাতে রিয়াদ থেকে জিও নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনারা সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন। পাকিস্তানি বাহিনী গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকলেও প্রকৃত লড়াই চালাচ্ছে সৌদি আরবের নিজস্ব বাহিনী।
খাজা আসিফের ভাষায়, পাকিস্তান ও তুরস্কের বাহিনী ‘সহায়ক ভূমিকা’ পালন করছে। তারা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকলেও বাস্তবে যুদ্ধ পরিচালনা করছে সৌদি আরবের নিজস্ব বাহিনী এবং তারাই হুতিদের কাছ থেকে এলাকাগুলো পুনর্দখল করছে।
এর ফলে সৌদি আরব যখন হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের ভূমিকা আপাতত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইসলামাবাদ আর কত দিন সরাসরি লড়াই থেকে দূরে থাকতে পারবে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তান সৌদি সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৮৫ সালের জুনে প্রকাশিত একটি অবমুক্ত সিআইএ মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, তখন সৌদি সেনাবাহিনীতে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার পাকিস্তানি সেনা কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তাবুকে একটি সাঁজোয়া ব্রিগেডও ছিল।
১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সৌদি আরবে বড় একটি সেনাদল পাঠিয়েছিল। তবে ওই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল মূলত প্রতিরক্ষামূলক।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করে পাকিস্তান। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসন হলে সেটিকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি আরব নিশ্চিত করে, যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমানসহ পাকিস্তানি একটি সামরিক দল দেশটির পূর্বাঞ্চলের কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। তবে সৌদি আরবে বর্তমানে কতজন পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে, তা প্রকাশ করেনি ইসলামাবাদ।
‘যেকোনো সীমা পর্যন্ত যেতে’ প্রস্তুত পাকিস্তান
গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে বলেন, সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তায় পাকিস্তানি সেনারা ইতিমধ্যে মোতায়েন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখানে আমি শারীরিকভাবে শব্দটির ওপর জোর দিতে চাই। আমরা যেকোনো সীমা পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।’
রিয়াদের সর্বশেষ বৈঠকে নতুন করে যে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে আইএসপিআর কোনো জবাব দেয়নি।
তবে মঙ্গলবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। মন্ত্রণালয় বলেছে, সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কার্যক্রমের বিস্তারিত বিষয় গোপনীয় এবং এগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে কোনো জল্পনা করা উচিত নয়।
তুরস্কের সামরিক ভূমিকা এখনো অস্পষ্ট
সৌদি আরবে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি অবশ্য তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট।
খাজা আসিফ বলেছেন, তুরস্কের সেনারাও সৌদি আরবে রয়েছে। তবে আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি আল জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরবে তুরস্কের স্থায়ী সেনা মোতায়েনের বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো স্বীকৃতি নেই। তিনি বলেন, তুরস্কের সংবিধানের ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে। অথচ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি এখনো তুরস্কের পার্লামেন্ট অনুমোদন করেনি।
সৌদি আরব কী ধরনের প্রতিরোধ চাইছে?
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফেরের মতে, সৌদি আরব মক্কা চুক্তিকে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে রাখতে চায় না; বরং এটিকে কার্যকর সামরিক প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
তাঁর মতে, আপাতত সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য হলো পাকিস্তান ও তুরস্কের সহায়তায় দেশটির ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে হুতিদের কাছে একটি বার্তা দেওয়া হবে—সৌদি আরবের ওপর নতুন কোনো হামলা হলে তা আর শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে না।
হুতিরা এর আগে সৌদি আরবের একাধিক শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহার করে আসছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় দেশটির দুটি বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। এতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
‘সব দায়ীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি
তবে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রিয়াদের পরিকল্পনা শুধু প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
এক্সে তিনি লিখেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কমিটি জোটের কাঠামোর মধ্যে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এসব হামলা এবং এর জন্য দায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দানিয়া থাফেরের মতে, এই বক্তব্যের ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, ‘এর জন্য দায়ী সবাই’—এই শব্দগুলোর মাধ্যমে হুতিদের সতর্ক করা হচ্ছে যে সৌদি আরব শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এসব হামলায় সহায়তাকারী কোনো পক্ষ বা অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। একই সঙ্গে বাইরের সমর্থকদেরও সতর্ক করা হচ্ছে যে রিয়াদ পুরো সহায়তা নেটওয়ার্কের ওপর নজর রাখছে।
পাকিস্তান বলছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক
সৌদি অবস্থানের তুলনায় পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
২ অক্টোবর ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, মক্কা চুক্তি মূলত প্রতিরক্ষামূলক।
তিনি বলেন, ‘নথিটিতে প্রথমেই বলা হয়েছে, এটি প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির জোট। এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই।’
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিনের মতে, পাকিস্তানের ভূমিকা বড় আকারের স্থলবাহিনী মোতায়েনের পরিবর্তে বিশেষায়িত সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে হতে পারে।
তাঁর মতে, পাকিস্তান আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আক্রমণাত্মক সাইবার বিশেষজ্ঞ, মাইন স্থাপন ও অপসারণে সক্ষম প্রকৌশলী এবং কিছু বিশেষ বাহিনীর সদস্য দিয়ে সৌদিতে বিদ্যমান উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এর চেয়ে বড় কোনো ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন তিনি।
তুরস্কের ভূমিকাও একইভাবে সীমিত থাকবে বলে মনে করেন গোকহান এরেলি। তাঁর মতে, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হবে নিয়ন্ত্রিত এবং মূলত স্থলভিত্তিক লড়াইয়ের বাইরে। এর মধ্যে থাকতে পারে কূটনৈতিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, জরুরি ভিত্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সম্ভবত নৌ বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
পাকিস্তান কি ইয়েমেনের ভেতরে যুদ্ধে জড়াবে?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের অংশগ্রহণ কি শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি সামরিক অভিযানে গিয়ে ঠেকবে?
দানিয়া থাফেরের মতে, বর্তমানে পাশাপাশি দুটি অভিযান চলছে। একটি হলো সৌদি আরবকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করা, যাতে শক্তি বাড়িয়ে হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে আর হামলা চালাতে না পারে।
পাকিস্তান তাদের ভূমিকা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা এখনো প্রকাশ্যে জানায়নি।
৩০ সেপ্টেম্বর রোমে সাংবাদিকেরা খাজা আসিফকে প্রশ্ন করেছিলেন, পাকিস্তানি সেনারা ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিয়েছে কি না। তিনি সরাসরি উত্তর দেননি।
তিনি বলেন, ‘আমি বিস্তারিত বলতে চাই না। তবে আমি যখন বলছি, সৌদি আরবকে রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থার অধীনে আমরা দায়বদ্ধ, তখন এর অর্থ হলো, আমাদের হাতে যে উপায়গুলো রয়েছে, সেগুলো সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা হবে।’
এই বক্তব্যই পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০১৫ সালেও ইয়েমেন নিয়ে একই অবস্থান নিয়েছিল পাকিস্তান
ইয়েমেন ইস্যুতে পাকিস্তান এর আগেও একই ধরনের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে।
২০১৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ইয়েমেন সংঘাতে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকা উচিত, যাতে সংকট সমাধানে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করা যায়। তবে একই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হলে বা পবিত্র স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে থাকবে।
সোমবারের যৌথ বিবৃতিতেও একই ধরনের যুক্তি দেখিয়ে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছে।
ইরানের উদ্বেগ
পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে ইরানও। রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের খবর সত্য নয় বলেই ইরান আশা করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন করে কোনো হস্তক্ষেপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
এর আগে গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন ইসহাক দার।
দার বলেন, ‘আমি তাঁদের জানিয়েছি যে আমরা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার। মুসলিম হিসেবে আমাদের এই চুক্তির সম্মান করতে হবে এবং ইনশাআল্লাহ আমরা তা করব।’
তিনি জানান, ইরানের নেতারা সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে হুতিদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে সোমবারের যৌথ বিবৃতিতে কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
পাকিস্তান সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে গেলে ইরানের ‘রেড লাইন’
তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় স্টাডিজ গ্রুপের বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, সৌদি ভূখণ্ড ও অবকাঠামো রক্ষা এবং ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলার মধ্যে ইরান স্পষ্ট পার্থক্য করে।
তাঁর মতে, পাকিস্তানের সেনা মোতায়েন যদি পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক হয় এবং শুধু সৌদি স্থাপনা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তেহরান তা মেনে নিতে পারে। তবে পাকিস্তান যদি হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে যোগ দেয়, তাহলে ইরান সেটিকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখবে। কারণ আরব উপদ্বীপে হুতিদের ইরান তার কৌশলগত গভীরতার অংশ হিসেবে দেখে।
হেইরান-নিয়া আরও বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিরপেক্ষতা থেকে সরে গিয়ে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ ব্যবস্থাপনার দিকে গেছে। ফলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন খুবই নাজুক।
ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের তুঘরাল ইয়ামিনও মনে করেন, পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের সামরিক সীমারেখা স্পষ্ট রাখা।
তিনি বলেন, ‘হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাতে পাকিস্তানি সেনারা জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ইসলামাবাদকে সতর্কভাবে নিজের সীমারেখা ঠিক করতে হবে। তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত নয়, তারা কীভাবে যুদ্ধে জড়াবে; বরং কীভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়।’
অভিযান কত দিন চলবে?
ইয়েমেন নিয়ে সৌদি আরবের লক্ষ্য কী, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
দানিয়া থাফেরের মতে, সৌদি আরব সম্ভবত এমন একটি স্বল্পমেয়াদি ও তীব্র অভিযান চায়, যা আবারও প্রতিরোধের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবে। আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ইয়েমেন যুদ্ধ রিয়াদ চায় না।
তবে চলতি সপ্তাহে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের দখলে যাওয়া অঞ্চল পুনরুদ্ধারের মধ্যে তারা নিজেদের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং ইরান-সমর্থিত হুতিদের দখলে থাকা রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্যও তাদের রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে।
থাফেরের মতে, সামরিক অভিযানের সময়কাল নির্ভর করবে লক্ষ্য কতটা বিস্তৃত, তার ওপর। তিনি বলেন, সৌদি ভূখণ্ড ও বাব আল-মান্দাব নিরাপদ রাখা হলে অভিযান সীমিত রাখা সম্ভব। কিন্তু হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করা বা সানা পুনর্দখলের চেষ্টা করলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সম্ভাব্যভাবে অনেক দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে উঠবে।
সামনে মূল প্রশ্ন
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি নিরাপত্তায় সহায়তার কথা বললেও দুই দেশই তাদের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষ করে পাকিস্তান বারবার বলছে, তাদের প্রতিশ্রুতি প্রতিরক্ষামূলক। কিন্তু সৌদি আরব যদি হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও বিস্তৃত করে এবং ইয়েমেনের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী কতটা নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আর সেই সিদ্ধান্ত শুধু সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্পর্কের জন্য নয়; ইরান, হুতি এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
kalprakash.com/IM