কারাগারে বন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার দাবিতে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ থেকে দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে বিশাল ‘লংমার্চ’ শুরু করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। সপ্তাহের শেষভাগে সরকারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দুই দফা সমঝোতা বৈঠক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর রোববার (৪ অক্টোবর) উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে এই কর্মসূচি শুরু করা হয়। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজধানীর সাধারণ জীবনযাত্রা ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পিটিআই ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী ও সমর্থক রোববার এই পদযাত্রায় অংশ নেন। মূলত গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই লংমার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সরকার ও পিটিআই নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে তা পিছিয়ে ৪ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে দুই দফা বৈঠকে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় না পৌঁছানোয় শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের পথই বেছে নেয় পিটিআই।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে বন্দি দেশের জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক নেতা ইমরান খানকে মুক্তি দিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলার সাজা ইতিমধ্যে উচ্চ আদালতে স্থগিত বা বাতিল হলেও অন্যান্য মামলায় তাঁকে আটক রাখা হয়েছে। দলটির অভিযোগ, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে বন্দি রাখা হয়েছে। সম্প্রতি ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানের ডান চোখের জটিলতার চিকিৎসায় বিলম্ব এবং তাঁর তিন বোনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সমর্থকদের ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন, আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, এই মিছিল আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে ইসলামাবাদের প্রায় ৮০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত খাইরাবাদে পৌঁছাবে এবং সেখান থেকে পরবর্তী ধাপের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিশাল বহর নিয়ে সমর্থকেরা লংমার্চে যোগ দিচ্ছেন।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানী ইসলামাবাদজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। শহরের প্রধান প্রবেশপথগুলোতে বিশালাকার শিপিং কনটেইনার বসিয়ে পথ অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি রোববার নিশ্চিত করেন, পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির ওপর সমঝোতা বানচালের অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো অবস্থাতেই রাজধানীতে অরাজকতা বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ হাইকোর্টের দেওয়া এক নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সতর্ক করেন, কোনো রাজনৈতিক দলেরই মহাসড়ক, টোল প্লাজা বা সরকারি ভবন দখলের আইনি অধিকার নেই।
মহসিন নকভি বলেন, ‘তারা যদি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে, তবে সে সাধারণ কর্মী হোক কিংবা শীর্ষ রাজনীতিবিদ, কেপির ভেতরে কিংবা বাইরে; আমরা প্রত্যেককে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেব। এবার আমরা নিশ্চিত করতে চাই, ইসলামাবাদে বারবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এই প্রচেষ্টার স্থায়ী অবসান ঘটুক।’
পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ফেলো জেমস ডরসি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে বলেন, ইমরান খান মূলত একজন পপুলিস্ট নেতা এবং তাঁর দল বিশাল জনসমর্থনপুষ্ট আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এই জনস্রোত ইসলামাবাদে প্রবেশ করলে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলেই সরকার তা যেকোনো মূল্যে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আফগানিস্তান সীমান্তে চলমান সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়াতে চায় না।
সূত্র: আল জাজিরা
kalprakash.com/IM