জীবনের অন্তিম ঠিকানা। ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত, প্রাচুর্য আর প্রিয় স্বজনের মায়া, প্রেম-ভালোবাসা—সবকিছুকে বিদায় বলে যেখানে অসীম-অন্তহীন যাত্রা। এখনো পৃথিবীর এমন কোনো শক্তি নেই, যা প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাতে পারে। যুগ যুগ ধরে একই ছাদের নিচে, পরিবারের মধ্যমণি হয়ে আদরে-স্নেহে-আলিঙ্গনে যে সম্পর্কের অটুট বন্ধন, তা নিমেষেই ছিন্ন হয়ে খোলা আকাশের নিচে সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে টেনে নিয়ে যাওয়ার যে অনিবার্য বাস্তবতা, তাকে কেউ রোধ করতে পারে না।
সবকিছুকে তুচ্ছ করে, সব আপনজনকে ছেড়ে প্রিয় মানুষটি অনাদিকালের জন্য যেখানে চিরঘুমে চলে যায়, সেটিই মুসলমানের আসল ঠিকানা। যে প্রিয় মানুষটি অনাদি-অনন্তকালের জন্য নির্দিষ্ট একটি মাটির ঘরে শায়িত হবে, তার এই যাত্রা কেমন হওয়া উচিত? পৃথিবীতে যে মানুষটি স্বজনদের বন্ধন ছিন্ন করে বিনা নোটিশে পারলৌকিক জগতে চলে যায়, তাকে আমরা তুচ্ছ করি লোভে, কোন স্বার্থে? আজ যিনি পরকালের পথে যাত্রা করলেন, সেখানে তিনি একা নন। আজ যাকে আমরা সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসি, তার পেছনের সহযাত্রী আমি, আপনি, আমরা প্রতিটি মানুষ। কী স্বামী, কী স্ত্রী, কী ছেলে-মেয়ে, কী মা-বাবা—একে একে সবার ঠিকানাই তো এই কবর।
বাঁশ-চাটাইয়ের পাটাতনে হিমশীতল ঘুম! যেখানে আমি, আপনি, আমরা সবাই যেকোনো সময়, এক নিঃশ্বাসের কঠিন সত্যকে আলিঙ্গন করে যাত্রা করতে প্রস্তুত, সেখানে আমাদের মনের ভেতরে এমন কোন নিষ্ঠুর পশু লাভের নেশায় বুঁদ হয়ে এই পারলৌকিক ঠিকানা নিয়ে ব্যবসা করে? চাল-ডাল, আদা-রসুনের মতো এখানেও কেন আমাদের টাকা কামানোর লোলুপ চাহনি? নিষ্ঠুর-নির্মম বাস্তবতা হলো, আজ আমরা এখানেও কোটি টাকার কোপ মারছি!
২০২৫ সালের জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভৌগোলিকভাবে ঢাকা একটি অতিমহানগরী। ওই সময়ের তথ্যানুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা তিন কোটি ৬৬ লাখ। ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। জনঘনত্বের বিচারে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। প্রতিদিন এই শহরের ধনী-গরিব সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন।
তাদের সবারই এক ঠিকানা। অথচ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের অন্তিম যাত্রার স্থান নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে চরম নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা। জনসংখ্যার তুলনায় কবরের স্থান একেবারেই নগণ্য। সরকার যায়, সরকার আসে। অথচ কবরস্থান নিয়ে একই সিস্টেম চলছে। কেউ এই সিস্টেম বদলাচ্ছে না। কবরস্থান নিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা ও সিন্ডিকেট জারি রেখে আগের প্রায় প্রতিটি সরকারই একটি চক্রকে সুযোগ করে দিয়েছে। কবরস্থান মানুষের আবেগের জায়গা। এই জায়গা নিয়ে কেউ মনোকষ্ট পেতে চায় না। এমনকি এটি নিয়ে বিন্দুমাত্র টানাহেঁচড়া, বিতর্ক, সমালোচনাও কেউ চায় না। এ জায়গা নিয়ে ব্যবসা হবে, কেউ সিন্ডিকেট করবে—এটিও কারো কাম্য নয়।
কিন্তু আগের রীতি মেনে শেষযাত্রা নিয়েও লাগামহীন ব্যবসা চলছে। বিশেষ করে রাজধানীর কিছু অভিজাত এলাকার কবরস্থান তো বলতে গেলে এখন সোনার হরিণ! অভিজাত এলাকার একটি সুপরিসর বিলাসবহুল আবাসিক ভবন কিংবা ফ্ল্যাটের চেয়েও বেশি দামে সাড়ে তিন হাতের একটি কবরের সুরক্ষা ফি! ভাবা যায়, রাজধানীর বনানী কবরস্থানের একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে হলে দিতে হয় সাড়ে চার কোটি টাকা? বর্গফুট হিসাব করলে এর দাম কতটা আকাশচুম্বী, তা সহজেই বোধগম্য হওয়ার কথা। তা-ও সারা জীবনের জন্য নয়, ২৫ বছরের জন্য। একজন প্রিয় মানুষের কবর কেন অনন্তকাল ধরে সংরক্ষিত থাকবে না? কেন প্রিয় স্বজনের অন্তিম যাত্রার স্থানটি ২৫ বছর পর নাই হয়ে যাবে? একজন প্রিয় মানুষের কবর তো অমূল্য। এ আবেগ তো দাম দিয়ে কেনার জিনিস নয়।
প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা স্মৃতির জাদুঘরের মতো। যখনই প্রিয় মানুষটির কথা মনে পড়বে, অন্তত তার কবরের পাশে গিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে তার আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা যাবে। যখনই ভালোবাসার আপনজনের মায়ায় মন বিষণ্ন কিংবা আবেগভারাক্রান্ত হবে, তখন তার শেষ ঠিকানার কাছে গিয়ে দুফোঁটা চোখের জল ফেললেও মনের কষ্ট দূর হয়। এই বিশ্বাসের দাম অমূল্য। এটি যার যায়, সে-ই বোঝে। কিন্তু এই জাদুর শহরে কোটি কোটি টাকায় কবর বন্ধক থাকে! তা-ও আবার ২৫ বছর পর এর ভাগ্য অনিশ্চিত। সামর্থ্যবান অনেকে হয়তো কোটি কোটি টাকা খরচ করে হলেও প্রিয় মানুষটির শেষ ঠিকানা সংরক্ষণ করতে চান। এটি তাঁর আবেগের জায়গা বলে বাধ্য হয়েই টাকাকেও তুচ্ছ করেন। কিন্তু কেমন সিস্টেম এটি? কারা এটি চালু করেছেন? মানুষের আবেগের জায়গা নিয়ে কেন ব্যবসা করতে হবে?
যাঁরাই এটি চালু করেছেন কিংবা যেভাবেই এটি রীতিতে পরিণত হোক না কেন, সময় এসেছে এই সিস্টেম বদলানোর। প্রায় পৌনে চার কোটি মানুষের এই রাজধানী ঢাকার যে কেউ মারা যেতে পারেন। রাষ্ট্রের অন্তত এটুকু চিন্তা করা উচিত, তার দেশের নাগরিক মারা গেলে সে যেন শেষযাত্রায় শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তার অন্তিম যাত্রা যেন টাকা, ব্যবসা কিংবা সিন্ডিকেটের পকেটের বিষয়ে পরিণত না হয়।
ঢাকার কবরস্থান ব্যবস্থাপনা করে সিটি করপোরেশন। রাজধানীর ভেতরে দুই সিটিই এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। আগের সিস্টেমে গলদ থাকলে তা পর্যালোচনা করে একটি পরিকল্পিত, স্থায়ী, টেকসই ও জনবান্ধব নীতিমালা করা দরকার, যেখানে কবরস্থান হবে সবার জন্য সমান সুযোগের। যেখানে-সেখানে নয়, কবরের জন্য বিক্ষিপ্তভাবে নয়, একেকটি পরিকল্পিত বিশেষায়িত স্থানই হতে পারে কবরের জন্য সুরক্ষিত জায়গা। আর এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যাতে প্রতিটি মানুষের কবর সারা জীবনের জন্য সুরক্ষিত থাকে। এটি কোনোভাবেই যেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য না হয়। প্রিয় স্বজনের কবরে গিয়ে মানুষ যেন তার জন্য দোয়া করতে পারে, সেখানে দাঁড়িয়ে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারে, অন্তত এই সংস্কৃতি গড়ে তোলা হোক।
বর্তমান সিটি করপোরেশনের আওতায় কবর নিয়ে এখন যে হযবরল অবস্থা, তা অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া। কিন্তু তাদের এখনকার দায়িত্ব হলো মানুষের শেষবিদায়ের জায়গা নিয়ে যেন আর কোনো বাণিজ্য বা সিন্ডিকেট গড়ে না ওঠে, তার ব্যবস্থা নেওয়া। কোটি কোটি টাকা দিয়ে কবর সংরক্ষণ করার মতো সংস্কৃতির কবর রচনা করা উচিত। একে আর সামনে টেনে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। প্রিয়জনের কবর নিয়ে আর ব্যবসা করতে দেওয়া ঠিক হবে না। এটি যেভাবেই হয়ে থাক না কেন, এর এখন সমাপ্তি প্রয়োজন। রাজধানীবাসীর কবরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার সংকুলান করা দরকার। এখানকার দুটি সিটি করপোরেশনই বিগত দিনের কোনো ভুল রীতি থেকে থাকলে তাকে বিদায় দিয়ে, অন্তত এ বিষয়ে জনবান্ধব পদক্ষেপ নিয়ে একটি ভালো কাজের জন্য মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার উদাহরণ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
kalprakash.com/IM