কথা ছিল পৌর এলাকার বর্জ্য শোধনের পর জৈব সার উৎপাদন করা হবে। কিন্তু সেটি কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাস্তবে এ-সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কথা হচ্ছে চুয়াডাঙ্গা স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগারের। শোধনাগারটি গত তিন বছর ধরে অযত্ন, অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পড়ে আছে। বিশাল জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপনায় বর্জ্য এলেও এটি পৌরবাসীর কাছে দুর্গন্ধযুক্ত আরেকটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ এই শোধনাগারের দায় নিতে চাইছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ৯ বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই শোধনাগারের প্রবেশমুখের গেটের চারপাশ লতাপাতায় ঢেকে গেছে। ডাম্পিং স্টেশন, পাম্প হাউস, ফিল্টার, পলিশিং ও সেটেলমেন্ট ট্যাংকসহ অত্যাধুনিক স্থাপনাগুলোও চারদিক থেকে জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। এখানে দেখার কেউ নেই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। পুরো স্টেশন দেখাশোনার জন্য ভেতরে একটি অফিসকক্ষ থাকলেও দিনের বেশির ভাগ সময় সেটি তালাবদ্ধ থাকে।
দিনের বিভিন্ন সময়ে পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডের ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে শোধনাগারে ফেলা হয়। প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ১০ থেকে ১৫ মিনিট পরপর ভ্যান ও ট্রাকে করে ময়লা নিয়ে আসেন। সংগৃহীত পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ সব ধরনের ময়লা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হয়। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ টন বর্জ্য জমা হচ্ছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বর্জ্য পড়ে থাকায় গোটা এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পাশের কৃষিজমির ফসল হুমকির মুখে পড়ছে। জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ কৃষক ও পৌরবাসী।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বুজরুকগড়গড়িতে তিন একর জমির ওপর ২০২৩ সালে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৮৫ হাজার ৪৬৪ টাকা ব্যয়ে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। তৃতীয় নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন সেক্টর প্রকল্পের আওতায় একটি স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও আরেকটি পয়োবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল, ডাম্পিং স্টেশনে পাম্প হাউস, ফিল্টার, পলিশিং, সেটেলমেন্ট ট্যাংকসহ অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। সেখানে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন করা হবে। পৌরসভার এমন জনবান্ধব কার্যক্রম করার কথা ছিল।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শোধনাগারটি চালুর জন্য একটি বেসরকারি সংস্থা যোগাযোগ করেছে। তবে সংস্থাটির সঙ্গে এখনো চুক্তি হয়নি। চুক্তি হলে শোধনাগারটি চালু করা হবে। দ্রুত চালুর জন্য আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।
পৌর এলাকার বুজরুকগড়গড়ি বনানী পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ জনি বলেন, “এই ডাম্পিং স্টেশন যে কারণে তৈরি করা হয়েছিল, তার কোনোটিই কাজে লাগছে না; বরং এটি অকেজো। এখানে শুধু ময়লা ফেলা হয়। ময়লা শোধনের কোনো কাজ আজও চোখে পড়েনি।”
আরেক বাসিন্দা আবদুল কাদির সোহান বলেন, “এই ডাম্পিং স্টেশন চালু না হওয়ায় এলাকার পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সারা দিন দুর্গন্ধ থাকে। বাতাস হলে দুর্গন্ধের মাত্রা আরও বাড়ে। পৌরসভা সার উৎপাদনের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখিনি। এই ডাম্পিং স্টেশনের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।”
ডাম্পিং স্টেশন এলাকার কৃষক আবু কাশেম বলেন, “এই ময়লা-আবর্জনার কারণে আমাদের কৃষকদের খুব ক্ষতি হচ্ছে। দুর্গন্ধের কারণে মাঠে কাজ করতে পারছি না। একই সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা ফসলের খেতে চলে আসছে। এতে ফসল ক্ষতির মুখে পড়ছে।”
চুয়াডাঙ্গা স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগারের ইনচার্জ জয়নাল আবেদিন বলেন, “এই বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের কথা ছিল। শোধনাগারের কার্যক্রম কবে উৎপাদনে ফিরবে, আমি জানি না। এটা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। শোধনাগারটি শুধু আমি দেখাশোনা করি, এর বাইরে কিছু নয়।”
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শরীফুল ইসলাম বলেন, “স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও পয়োবর্জ্য শোধনাগারটি চালুর জন্য বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হলে চালু করা হবে। দ্রুত চালুর জন্য আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। শোধনাগারটি যে প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছিল, ওই প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তাঁরা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে তাঁরা বিভিন্ন সহযোগিতার কথা বলেছেন। আশা করি, পূর্ণাঙ্গভাবে স্টেশনটি চালু করা হবে।”
kalprakash.com/IM