বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬ | ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | দুপুর ২:৫০:৫৪

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৬
শেয়ার: mail
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। বর্তমানে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ করে আসছে ঢাকা। এমন পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও জানিয়ে আসছে ঢাকা। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নতুন করে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।’ সোমবার সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।’

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরব আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা জানা যায়নি। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রটি এ তথ্য জানিয়েছে।

চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় তিনটি সুন্নি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে করা হয়েছে। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো অঙ্গীকার করেছে, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাসগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

এদিকে তুরস্ক জানিয়েছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা ‘মক্কা চুক্তি’ আরও দেশকে যুক্ত করে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্কের। অন্যদিকে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ।

মধ্যপ্রাচ্যে যখন আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। এর মধ্যে ইরান থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। তুরস্কের মতো বাংলাদেশও একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র। তবে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের সুন্নি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ সাধারণত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাই কোনো সামরিক জোটে জড়ালে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের তৈরি পোশাকের সিংহভাগই যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এ ছাড়া বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্সও বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের পাঠানো অর্থ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া মনে করেন, বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, বরং চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হঠাৎ করে নষ্ট হবে না। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে দেশটি কোন পক্ষের সঙ্গে আছে, এমন প্রশ্ন এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসের মাথায় সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এই আমন্ত্রণ এলো। এমন সময়ে এই প্রস্তাব এসেছে, যখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। তবে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

চলতি মাসে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনা কথা বলার পর এ ধরনের সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে হাসিনার ওই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে ঢাকা।

মক্কা চুক্তির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে ভারত বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নাও দেখতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাংলাদেশকেই বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ কয়েকটি দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শুধু অন্য দেশ কী ভাববে, সেটিকে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের প্রধান মাপকাঠি করা উচিত নয়।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ

বিস্তারিত কমেন্টে