প্রায় আট বছর আগে ঢাকার একটি স্বনামধন্য জুয়েলারি শপের শোরুম থেকে ১০ হাজার টাকায় একটি হীরার নাকফুল কিনেছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা সাবিনা আক্তার। তখন দোকানে থাকা একটি যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে বিক্রেতারা দাবি করেছিলেন, সেটি আসল হীরা।
মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাকফুলটি ব্যবহার করে বাকি সময় সযত্নে তুলে রাখতেন সাবিনা। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নাকফুলের পাথরের অংশটির রং বদলে কালচে হতে থাকে। তিনি ভেবেছিলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণেই হয়তো উজ্জ্বলতা কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল হীরার উজ্জ্বলতা কমার কোনো সুযোগ নেই।
সাবিনা আক্তার বলেন, শখের বশে তখন ভালো দাম দিয়েই নাকফুলটি কিনেছিলাম এবং আসল ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি হীরাটি কালচে হয়ে যাচ্ছে। ল্যাবে পরীক্ষা করলে নকলই প্রমাণিত হবে। তাই আর পরীক্ষাও করছি না।
দুই-তিন বছর আগে ঢাকার আরেকটি জুয়েলারি দোকান থেকে আট হাজার টাকায় হীরার নাকফুল কিনেছিলেন মিতি হাসান। ব্যবহারের এক বছর পার হতেই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিচিত এক স্বর্ণকারের কাছে নিয়ে যান তিনি। তখন সেই কারিগর জানান, নাকফুলে ব্যবহৃত বস্তুটি হীরা বা কাচ নয়, বরং প্লাস্টিকের তৈরি পাথর।
মিতি হাসান জানান, নাকফুলটি আসল নয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরিবর্তনের অনুরোধ করলে তারা জানায় ডায়মন্ড বদল করা হয় না। ফলে প্রতারণার বিষয়টি তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হন।
গণমাধ্যমে সম্প্রতি নকল হীরা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ শুরু হয়েছে। অতীতে কেনা অলংকার আসল নাকি নকল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বহু ক্রেতা।
বাংলাদেশে হীরার খনি বা উৎপাদন নেই। ২০১৮ সালের পর থেকে বৈধভাবে হীরা আমদানিও প্রায় শূন্যের কোঠায়। সরকারি তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈধ পথে হীরা আমদানি হয়নি বললেই চলে। অথচ দেশের হীরার বাজারের আকার এখন প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে থাকা অধিকাংশ হীরা হয় চোরাচালানের মাধ্যমে আসছে, নয়তো ল্যাবে তৈরি নকল হীরা (মোজানাইট, জারকন) কিংবা সাধারণ কাচকে আসল বলে বিক্রি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ক্যারেট (০.২ গ্রাম) হীরার দাম শুরু হয় প্রায় ৮৩ হাজার টাকা থেকে, যা মানভেদে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অথচ দেশের বাজারে মাত্র কয়েক হাজার টাকায় কথিত হীরার অলংকার মিলছে, যা অবাস্তব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) তথ্যমতে, চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার সোনা ও ডায়মন্ডের অবৈধ লেনদেন বা পাচার হয়। প্রতারণা এড়াতে সংগঠনটি ৫০ সেন্টের ওপর সব হীরার গহনায় বাধ্যতামূলক সনদ প্রদান, ন্যূনতম ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ ব্যবহার এবং ক্যাশ মেমোতে স্পষ্ট গুণগত মান উল্লেখের নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া নামসর্বস্ব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান থেকে গহনা না কেনার আহ্বানও জানিয়েছে বাজুস।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জানান, প্রতারণার শিকার হয়েও অনেকে অভিযোগ দায়ের করেন না, যার সুযোগ নেয় অসাধু চক্র। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়লে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে তিনি অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে যাচাই-বাছাই ও সনদের নিশ্চয়তা ছাড়া হীরার অলংকার না কেনার পরামর্শ দেন।
kalprakash.com/IM