শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬ | ৬ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৮ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | ভোর ৫:৫৪:৫১

নদীর বালুতে সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবের সম্ভাবনা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৫
শেয়ার: mail
নদীর বালুতে সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবের সম্ভাবনা

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক বিশ্বসভ্যতার প্রতিটি পদক্ষেপে এখন স্পন্দন জোগাচ্ছে এক অতিক্ষুদ্র উপাদান—‘সেমিকন্ডাক্টর’ বা মাইক্রোচিপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফাইভজি/সিক্সজি নেটওয়ার্ক, স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবকিছুরই মূল প্রাণভোমরা এই চিপ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এ যুগে গোটা বিশ্বে যখন চিপ তৈরির কাঁচামালের তীব্র হাহাকার চলছে, ঠিক তখনই আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর তলদেশে জমে থাকা কোটি কোটি টন বালু।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রমত্তা পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র আর তিস্তার বুকে জমে থাকা বালুরাশি শুধুই পলি নয়; এটি বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হতে পারে। সঠিক রোডম্যাপ, আধুনিক গবেষণা ও নীতি সহায়তার মেলবন্ধন ঘটলে তৈরি পোশাক শিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টরই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি বদলের মূল চালিকাশক্তি।

বিশ্ববাজার ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়:

বর্তমানে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার ৬০০ বিলিয়ন ডলার হলেও ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মধ্যেই এটি ১ ট্রিলিয়ন অতিক্রম করে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এ খাতে কোটি কোটি ডলার ভর্তুকি দিচ্ছে।

বিপুল সম্ভাবনার এ বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সামান্য—বার্ষিক আয় মাত্র ৫০ লাখ ডলার, যার বড় অংশই আসে আইসি (IC) ডিজাইন সেবা থেকে। তবে ২০৩১ সালের মধ্যে এ শিল্পকে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

‘উলকাসেমি’র প্রেসিডেন্ট ও সিইও মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান বলেন, “সিলিকন ওয়েফার উৎপাদন, আইসি চিপ তৈরি, প্যাকেজিং ও পরীক্ষাকরণের ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারলে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান আয়কে স্পর্শ করবে।”

নদীর বালুতে ৩০০ কোটি টন কোয়ার্টজ:

জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের (জিএসবি) তথ্য অনুযায়ী, যমুনা, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকায় প্রায় ৩০০ কোটি টন বালুসম্পদ রয়েছে, যার গড়ে ২৮.৭ শতাংশই কোয়ার্টজ বা সিলিকা। প্রচলিত শোধনে নদীর বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সিলিকা পাওয়া সম্ভব, যা গ্লাস ও অপটিক্যাল ফাইবার তৈরিতে দরকারী।

তবে মাইক্রোচিপ তৈরির জন্য ‘ইলেকট্রনিক গ্রেড পলিসিলিকন’-এর বিশুদ্ধতা হতে হয় ৯৯.৯৯৯ শতাংশ বা ‘নাইন নাইন’ পিউরিটি। জিএসবি-র উপপরিচালক ড. মো. সোহেল রানা জানান, অতি সামান্য আয়রনের উপস্থিতি চিপ তৈরিতে বাধা দেয়। তাই সরাসরি বড় চিপ কারখানা না বানিয়ে প্রথম ধাপে উচ্চ শুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদন, আইসি ডিজাইন এবং অ্যাসেম্বলিং ও টেস্টিং (OSAT) খাতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

‘সিলিকন রিভার’—বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর স্বপ্ন:

বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) নেতৃত্বে চলছে ‘সিলিকন রিভার’ উদ্যোগ। সংগঠনটির সভাপতি এম এ জব্বার জানান, দেশে বর্তমানে ১,২০০ পেশাজীবী ও ২০টির বেশি চিপ ডিজাইন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার ইইই ও সিএসই স্নাতক বের হওয়া দেশের বড় সম্পদ। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারের সেবা ও পণ্য রপ্তানির অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

২০২৬ থেকে ২০৫০: পাঁচ ধাপের রোডম্যাপ:

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার মডেলে ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের কাজে এগোতে হবে। প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী:

  • প্রথম ধাপ (২০২৬-৩০): দেশব্যাপী কোয়ার্টজ অনুসন্ধান ও স্যান্ড প্রসেসিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (SPRC) প্রতিষ্ঠা।

  • দ্বিতীয় ধাপ: বাণিজ্যিক হাই-পিউরিটি সিলিকা উৎপাদন ও আইসি ডিজাইন জোরদার।

  • তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ: পাইলট ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন ও নিজস্ব চিপ উৎপাদন কারখানা।

  • পঞ্চম ধাপ (২০৫০): উদ্ভাবনচালিত উচ্চপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব।

সরকারি নীতি সহায়তা ও সম্ভাবনা:

সরকার সেমিকন্ডাক্টরকে জাতীয় মিশন ঘোষণা করে কাঁচামালে শুল্ক প্রত্যাহার, রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা, বছরে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ অনুদান ও কালিয়াকৈরে ১,৫০০ কোটি টাকার ডিজাইন হাব অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সম্প্রতি এক সামিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “তৈরি পোশাকের পর সেমিকন্ডাক্টরই হতে পারে দেশের নতুন অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।”

আন্তর্জাতিক তীব্র প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রম ব্যয়ের যে সুবিধা রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে নদীর বালুকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

নদীর বালুতে সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবের সম্ভাবনা

বিস্তারিত কমেন্টে