রাজধানীর মিরপুর এলাকায় সরকারি চাকরি ও টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার নামে সংঘবদ্ধ প্রতারণা এবং কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ফরিদুল আলম নিজেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর নেতা ও সরকারি ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজিয়া ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তিনি পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন।
চাকরির টোপ, টেন্ডারের প্রলোভন
অভিযোগ অনুযায়ী, রাজিয়া ট্রেডার্সকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। সরকারি চাকরির “গ্যারান্টি”, বড় প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ থাকার দাবি করে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, অনেকে জমি বিক্রি, স্বর্ণ বন্ধক কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে টাকা দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি বা কাজ তো দূরের কথা—পরে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় ভয়ভীতি ও হুমকি।
মিরপুরে ঘাঁটি গড়ে নেটওয়ার্ক
অভিযুক্তের স্থায়ী ঠিকানা লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়ন হলেও দীর্ঘদিন তিনি ঢাকার মিরপুর–২ নম্বর সেকশনের বড়বাগ এলাকায় অবস্থান করতেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এখান থেকেই পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তিনি নিজেকে আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে সহজেই মানুষের আস্থা অর্জন করতেন।
নারী চক্র দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, অভিযুক্তের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ নারী চক্র সক্রিয় ছিল। টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে পরে ভিডিও, ছবি বা মিথ্যা অভিযোগের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হতো।
যারা টাকা ফেরত চাইতেন বা প্রতারণার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেন, তাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি কিংবা ফৌজদারি মামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি
সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলার পর তাকে WhatsApp-এ হুমকিসূচক বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বার্তায় তাকে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও মামলা সংক্রান্ত কাগজপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
একটি বার্তায় লেখা হয়েছে বলে অভিযোগ—
“আমি কী করতে পারি আর না পারি, সেটা পরে প্রমাণ হবে… তোকে অ্যারেস্ট করাবই—এই আমার চ্যালেঞ্জ।”
ভুক্তভোগীদের মতে, এমন ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসের কারণেই বহু মানুষ এখনও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
আত্মগোপনে অভিযুক্ত
অভিযোগের বিষয়ে ফরিদুল আলম কিংবা রাজিয়া ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ এবং তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সর্বস্বান্ত পরিবার
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “সরকারি ঠিকাদার পরিচয়ে বিশ্বাস করেছিলাম। চাকরির আশায় জমি বিক্রি করেছি। এখন টাকা চাইলে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হচ্ছে।”
আরেকজন বলেন, “বছরের পর বছর ঘুরছি। শুরুতে সময় নিত, পরে ফোন বন্ধ। এখন শুনছি এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।”
তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট থানার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্র বলছে, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় দল নেবে না; অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত ফরিদুল আলম ও রাজিয়া ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















