বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬ | ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ২:০০:৫৮

রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর: শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন, বাড়ছে বহুমাত্রিক সংকট

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৩
শেয়ার: mail
রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর: শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন, বাড়ছে বহুমাত্রিক সংকট

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হলো আজ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের নানা প্রতিশ্রুতি, মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের পরও এই দীর্ঘ সময়ে একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

উল্টো গত দেড়-দুই বছরে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় ক্যাম্পগুলোতে বাড়ছে হতাশা, অপরাধ, মাদক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা। একই সঙ্গে খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও নিরাপত্তার অভাবে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিতে চাপ বাড়ছে বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এ ছাড়া নোয়াখালীর ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে আরও ৩৩ হাজার ৮১৯ জন। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সম্প্রতি অনুপ্রবেশকারী নতুনদের মিলিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার প্রকৃত সংখ্যা এখন ১৪ লাখেরও বেশি।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জাতিসংঘ মিয়ানমার বাহিনীর ওই দমন-পীড়নকে জাতিগত নিধনের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এর আগে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছিল। তবে ২০১৭ সালের ঢল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দ্রুততম।

৯ বছর পরও রোহিঙ্গাদের মৌলিক জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাঁশ ও ত্রিপলের খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস, সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট, খাদ্য সহায়তা হ্রাস এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

২০২৪ সাল থেকে রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। অনেকে দুর্গম ও গোপন পথে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, যা জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

দীর্ঘ ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক চোরাচালানকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। আরসা ও আরএসওসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সাধারণ রোহিঙ্গারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে তিন শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে আড়াই শতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। নিয়মিত অভিযানে ক্যাম্পগুলো থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), বিদেশি রাইফেল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অনুদান হ্রাস পাওয়ায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু মাসিক খাদ্য সহায়তা সাড়ে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে নামিয়ে এনেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, বরাদ্দ আরও কমলে নারী ও শিশুদের মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়বে। ২০২৬ সালের মানবিক সহায়তার জন্য জাতিসংঘ ও এর শতাধিক সহযোগী সংস্থা যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) আওতায় প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।

গত ৯ বছরে একাধিকবার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, প্রত্যাবাসন তালিকা বিনিময় ও পাইলট প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ কয়েক দফায় মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার বিস্তারিত তথ্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। এর মধ্যে মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এখনো প্রত্যাবাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি পাওয়া যায়নি।

আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি—মিয়ানমারের নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, পূর্ণ নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজ গ্রাম ও ভিটামাটিতে পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘শুধু তালিকা প্রস্তুত করে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ বদলানো যাবে না। মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদে নিজের ভিটায় ফেরার নিশ্চয়তা দিতে হবে।’

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি তৃতীয় কোনো দেশে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও জোর দিতে হবে।’

দীর্ঘ সময়ে কক্সবাজারের স্থানীয় পরিবেশ ও শ্রমবাজারেও রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বসতি নির্মাণ ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের ফলে উখিয়া ও টেকনাফের হাজার হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। নষ্ট হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ক্যাম্পের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে কৃষিজমি ও জলাশয়।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যাবাসন যত বিলম্বিত হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা তত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপহরণ, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও সন্ত্রাসী চক্রের অপতৎপরতা রুখতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, যেখান থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে, রাখাইনের সেই এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে না আসায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। এ সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে এ সংকট শুধু মানবিক বিপর্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে রূপ নেবে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর: শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন, বাড়ছে বহুমাত্রিক সংকট

বিস্তারিত কমেন্টে