বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে গত এক দশকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১৯টি বৃদ্ধি পেয়েছে। বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুন্দরবনে মোট ১২৫টি বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালের প্রথম ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি এবং ২০১৮ সালের জরিপে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১১৪টিতে।
দৈনিক ইত্তেফাক-এর এক প্রতিবেদন সূত্র জানায়, বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনে বাঘের ঘনত্ব গড়ে ২.১৭টি।
তবে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার স্বস্তির খবরের মাঝেও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা ও টিকে থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশ রক্ষা সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ জানান, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ৯১টি বাঘের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে চোরাশিকারিদের নির্বিচার হত্যা ও লোকালয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে ৫৮টি বাঘ। এ ছাড়া বার্ধক্য ও অসুস্থতাজনিত কারণে ৩০টি এবং সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩টি বাঘের প্রাণহানি ঘটেছে। বনাঞ্চলে হরিণ শিকারিদের তৎপরতা এবং চোরাচালানকারীদের অবাধ বিচরণ সুন্দরবনের মূল প্রাণ বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাঘের বাস্তুতন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান শৃঙ্খলা বিষয়ের গবেষক অধ্যাপক ড. সামিউল হক জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের অবাধ বিচরণের জন্য ৬০ থেকে ১৫০ বর্গকিলোমিটার এবং স্ত্রী বাঘের জন্য ২০ থেকে ৬০ বর্গকিলোমিটার সুরক্ষামূলক বনাঞ্চল প্রয়োজন। বাঘ সংরক্ষণে বিষ দিয়ে ও ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার বন্ধ করা, চোরা শিকারিদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তিনি।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ডিসিপ্লিন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন সুন্দরবনে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকোচন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে এবং খাদ্যের শৃঙ্খল বজায় রাখতে অবৈধ হরিণ শিকারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চিহ্নিত ১৩৫ জন হরিণ পাচারকারীর তালিকা তৈরি করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার রক্ষায় সরকার বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হরিণ পাচারবিরোধী বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি চোরাশিকারিদের পেতে রাখা তারের ফাঁদে মারাত্মক আহত হওয়া একটি রাজকীয় বাঘকে টানা ছয় মাস নিবিড় চিকিৎসা সেবা ও পর্যবেক্ষণ শেষে আবারও সুন্দরবনের গহীনে নিরাপদে অবমুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক
kalprakash.com/IM