আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পরিসরে যাচ্ছে সরকার। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ মিলিয়ে আগামী এক বছরে রুফটপ সোলার থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার অব্যবহৃত ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় থাকছে ৬ হাজার ৫৪৪টি স্থাপনা।
স্থানীয় সরকারের ছাদে ৩০০ মেগাওয়াট
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার কার্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, ওয়াসা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং হাটবাজার ও গ্রোথ সেন্টারের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হচ্ছে।
এ জন্য প্রাথমিকভাবে ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থ যুক্ত করে সক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াটে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাজে ব্যবহার করবে। বাড়তি বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০০ মেগাওয়াটের প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা ব্যবহার করবে এবং বাকি প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
বেসরকারি খাতেও খুলছে বড় সুযোগ
শুধু সরকারি স্থাপনা নয়, রুফটপ সোলারের বাজার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্যও উন্মুক্ত করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা হবে।
এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ভবন, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে পারবে।
ফলে ভবন মালিককে বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ করতে হবে না। চুক্তির ধরন অনুযায়ী ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে মালিক ভাড়াও পেতে পারেন।
রুফটপ সোলারের জন্য তিন ধরনের মডেল বিবেচনা করা হচ্ছে—উৎপাদিত বিদ্যুৎ পুরোটা নিজস্ব ব্যবহারে রাখা, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি ভবন মালিককে ছাদ ব্যবহারের ভাড়া দেওয়া।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বড় লক্ষ্য
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার অন্তত ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ু, বর্জ্য, জলবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অ্যাগ্রি-ভোল্টাইকসসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ আসছে গ্রিডে
বেসরকারি খাতের ১২টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এসব প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তিবদ্ধ প্রকল্পগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াট, পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৫০ মেগাওয়াট, কক্সবাজারে দুটি ১০০ মেগাওয়াট এবং বাগেরহাটের মোংলায় ১০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প রয়েছে। দেশের আরও কয়েকটি জেলায় অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সেচ পাম্পেও সৌরবিদ্যুৎ
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর ৬০ থেকে ৬২ হাজার সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, সৌরচালিত পাম্প চালু হলে ডিজেলের ব্যবহার কমবে এবং কৃষকের সেচ খরচও কমে আসবে।
সৌর সরঞ্জামে কর সুবিধা, ঋণে ১,৫০০ কোটি টাকা
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমাতে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট যোগ্য সরঞ্জাম আমদানিতে মোট কর ১ শতাংশে নামিয়ে আনার সুবিধাও কার্যকর করা হয়েছে।
এ ছাড়া গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপনে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ইডকল, বিআইএফএফএল ও পিকেএসএফের মাধ্যমে এ অর্থায়ন করা হবে।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য সক্ষমতা কত?
স্রেডার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৮৫৬.৬৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৬৩.৫৪ মেগাওয়াট। এছাড়া বায়ু থেকে ৬২ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়োগ্যাস ও বায়োম্যাস থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বড়। অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও কমানো সম্ভব। তবে নেওয়া উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।