শুক্রবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের পর শনিবারও একের পর এক পরাঘাতে কেঁপে ওঠে বিভিন্ন জনপদ। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্য আমেরিকার দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে দেশের ১০টি প্রদেশ এবং দুটি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পে কেন্দ্রের কাছাকাছি কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে বাড়িঘর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পবিদেরা শতাধিক পরাঘাত শনাক্ত করেছেন। এগুলোর মধ্যে ৫ দশমিক ৮, ৫ দশমিক ৫ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পনও ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল পানামার মধ্যাঞ্চলীয় হেরেরা প্রদেশের প্রত্যন্ত পিতালোজা আরিবা জনপদের প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। প্রতিবেশী কলম্বিয়াতেও কম্পন অনুভূত হয়।
রাজধানী পানামা সিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা জানান প্রেসিডেনশিয়াল মিনিস্টার হুয়ান কার্লোস ওরিলাক। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে বাড়িঘর, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, সড়ক ও হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতীয় বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উপপরিচালক মালিতজি রিভেরা জানান, ভূমিকম্পে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের আঘাতের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি।
ক্ষতিগ্রস্ত শত শত বাড়ি ও বিদ্যালয়
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় ভেরাগুয়াস, হেরেরা, কোকলে ও লস সান্তোস প্রদেশে।
বেসামরিক সুরক্ষা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪২০টি বাড়ি এবং সমসংখ্যক সরকারি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া সাতটি হোটেল, অন্তত ১৩টি গির্জা ও নয়টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ঔপনিবেশিক আমলের জনপদ লা ভিয়া দে লস সান্তোসে কয়েকটি বাড়ি এবং একটি ঐতিহাসিক ক্যাথলিক গির্জা ধসে পড়েছে। রাতভর রাস্তায় কাটানো বাসিন্দারা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষায় ছিলেন।
ভূমিকম্পে নিজের বাড়ির একাংশ ধসে পড়েছে টনি হিমেনেজের। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি তাঁবুর নিচে বসে তিনি বলেন, ‘গতকাল দুপুর একটা থেকে আমরা এখানে আছি। একটুও নড়িনি।’
৯০ বছর বয়সী হিমেনেজ আরও বলেন, ‘এটা ছিল ভয়াবহ ঘটনা। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, জীবনের ৯০ বছরে এমন কিছু কখনো দেখিনি। কম্পন ছিল প্রচণ্ড—সত্যিই প্রচণ্ড।’
শনিবার পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানায়নি কর্তৃপক্ষ। তবে ভূমিধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
প্রাণহানি এড়ানোর কারণ ভবন নির্মাণবিধি?
ভূমিকম্পের তীব্রতা সত্ত্বেও পানামায় ব্যাপক প্রাণহানির খবর না আসার পেছনে দেশটির কঠোর ভবন নির্মাণবিধির ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে রাজধানীতে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির ভূকম্পবিদ্যা বিভাগের প্রধান কার্লোস ভালদেস এমনটাই মনে করেন। তবে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলতে থাকায় পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
ভূমিকম্পের পর মধ্য আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ পানামার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো শুক্রবার চিলি, উরুগুয়ে ও গুয়াতেমালাসহ কয়েকটি দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়ে তাঁদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করতে একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠানো হয়েছে। দলটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিশেষজ্ঞ সহায়তার পাশাপাশি আকাশপথে এবং সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করবে। মানবিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৫০ লাখ ডলার দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড জানিয়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক ব্যুরোর সহায়তায় দুটি হেলিকপ্টারে করে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৯০৭ কেজি খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর এখন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার, সহায়তা বিতরণ এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারই পানামা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
kalprakash.com/IM